Home / প্রতিবেদন / প্রকৃতিতে গণিত / মৌমাছি—বিস্ময়কর এক ভেক্টর গণিতবিদ !

মৌমাছি—বিস্ময়কর এক ভেক্টর গণিতবিদ !

তৈলাক্ত বাঁশের বানর

“আপুর বইয়ে একটা অঙ্ক দেখলাম, বাবা—তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উপরে উঠছে এক বানর। বানরটি এক মিনিটে ৩ মিটার উঠে, আবার পরের মিনিটেই পিছলে ১ মিটার নেমে যায়। বানররা কি এরকম করে, বাবা? আর এ অঙ্ক করেই বা কী কাজ হবে?” এক অপরাহ্নে, পারিবারিক চায়ের আসরে, আমার ছোট মেয়ে ফারিনের প্রশ্ন।

প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসেন মেয়েদের মা। মেয়ের চুল নেড়ে দিতে দিতে আমি বলি, “তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠার মতো বাঁদরামী বানররা হয়তো কখনো করবে না। অঙ্কটি যারা তৈরি করেছেন, তারা বাস্তব জীবনের সাথে মিল রেখে একে তৈরি করতে পারতেন। তবে কোনো গণিতই অর্থহীন নয়, কারণ গণিত চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে। যেকোনো বিষয়কে সুশৃঙ্খল সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে গণিত, ফলে তা বুঝতে সহজ হয়। আর গণিতের সবচেয়ে বড় উপকারটি হলো, এটি তোমার মনে মায়া মমতা সৃষ্টি করবে।”

“গণিত কিভাবে মমতা সৃষ্টি করে, বাবা?” বড় মেয়ে জেরিনের প্রশ্ন।

“তুমি যখন চারপাশে উড়ে যাওয়া পাখি, খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়া পিঁপড়া, কিংবা মধুর সন্ধান পাওয়া মৌমাছির দিকে তাকাও, মনে হতে পারে এগুলো নিতান্ত সাধারণ প্রাণীর সহজ সরল ঘটনা। কিন্তু তুমি যদি শোনো প্রাণীগুলি কতই না চমৎকার অথচ জটিল গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে, খুব অবাক হবে। এই যে মৌমাছি, তাকে খুব উঁচু মাপের একজন গণিতবিদই বলা চলে—একথা যখন শুনবে, উপলব্ধি করবে মোটেও তুচ্ছ নয় সে, মানুষের কাছে রয়েছে তার সম্মানের দাবী। আর তখন, মৌমাছির প্রতি তোমার গড়ে উঠবে বিস্ময়মাখা এক মমতা।”

“মৌমাছি গণিত জানে!” হা হয়ে যায় ফারিনের মুখ।

“হ্যাঁ, বলছি তাহলে, শোনো। তার আগে স্থানাংকবিদ্যা (Coordinate System) নামে গণিতের একটি শাখার ব্যাপারে হালকা ধারণা থাকতে হবে তোমাদের।” আমি দ্রুত একটি ছবি এঁকে তুলে ধরি মেয়েদের সামনে।

লালমাটিয়ার বাড়ি

Lalmatia

“মনে করো, এটি ঢাকার লালমাটিয়া এলাকা, যা A, B, C,… বিভিন্ন ব্লকে বিভক্ত। প্রতিটি ব্লকে আবার রয়েছে 1, 2, 3, … করে বিভিন্ন বাড়ির নম্বর। এখন বলো, কেউ হাসপাতালটিকে কিভাবে খুঁজে পাবে?”

“তাকে E-ব্লকের 2-নম্বর বাড়িতে যেতে হবে।” জেরিন দ্রুত উত্তর দেয়।

“আর মসজিদটি হলো A-ব্লকের 5-নম্বর বাড়ি।” বোনের কথা শেষ হতে না হতে ফারিনও চিৎকার দিয়ে উঠে।

“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। কত সুন্দর ব্যবস্থা, দেখ। যেকোনো বাড়িতে যেতে হলে, তোমার শুধু দুটি জিনিস জানতে হবে: ব্লক নম্বর আর বাড়ির নম্বর। কেউ যদি বলে, ছবির বহুতল শপিং কমপ্লেক্সের ঠিকানা কী, তাহলে আরো সংক্ষেপে (D, 4) বললেই হবে। সাথে সাথে সবাই বুঝে যাবে, এটি D-ব্লকের 4-নম্বর বাড়ি।”

“কিন্তু লালমাটিয়া এলাকায় কি সত্যি সত্যি এভাবে বাড়ির নম্বর আছে! তাহলে মানুষ বাড়ি খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যায় কেন?”

“না, আমাদের দেশে এভাবে বাড়ির নম্বর দেয়া হয় না। যারা নগরের পরিকল্পনা করেন, তারা যদি ভালো গণিতও জানেন, গণিতকে ভালোবাসেন না। আর এ কারণে, আমাদের চারপাশে এত বিশৃঙ্খলা।

এখন দেখো—নীচের গাছ, রাস্তা, দালান বিশিষ্ট কোণার জায়গাটি, যেখান থেকে লালমাটিয়া এলাকা শুরু হয়েছে, তাকে আমরা বলি মূলবিন্দু (Origin)। মূলবিন্দু থেকে লালমাটিয়ার যেকোনো জায়গাকে দুটি মাত্র প্রতীক দ্বারা আমরা প্রকাশ করতে পারি। এভাবে সংক্ষেপে, সুশৃঙ্খলভাবে কোনো জায়গার অবস্থান নির্দেশ করার পদ্ধতিকেই বলা হয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা। যদিও নগর পরিকল্পনায় এর প্রচলন ছিল বেশ বহু আগে থেকেই, গণিতে একে প্রথম প্রকাশ করেন মহান দার্শনিক বিজ্ঞানী রেনে ডেকার্তে (René Descartes)।”

ডেকার্তে’র মাছি

জনশ্রুতি আছে, তীব্র এক গরমের দিনে, বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অসুস্থ ডেকার্তে—ক্লান্ত এক মাছি ছাদে ইতঃস্তত ঘোরাঘুরি করছে।

খুব মজা পেলেন ডেকার্টে, মনে মনে ভাবলেন, “বেচারা মাছিটি জানেও না, সে তার চলার পথে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার ফুটিয়ে তুলছে।” খানিক পর মনে হলো, “ইসস, যদি কোনোভাবে মাছিটির বক্রপথের বিন্দুগুলিকে চিহ্নিত করে তাদের অবস্থান মাপা যেত, তাহলে হয়তো তার চলার পথটিকেও গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা যেত।”

এক সময় হঠাৎ তিনি উপলব্ধি করলেন, আরে বিন্দুগুলোর অবস্থান তো খুব সহজেই মনে রাখা যায়! বিক্ষিপ্তভাবে ছাদের চার কোণা থেকে মাছির অবস্থান চিন্তা না করে, শুধু এক কোণা থেকে হিসেব করলেই তো হয়। এক কোণা থেকে বেরিয়ে যাওয়া, দেয়ালের দুই সংস্পর্শ লাইন থেকে দূরত্ব পরিমাপ করাই যথেষ্ট। তার মানে মাছিটি এক লাইন থেকে 3 ফুট, আরেক লাইন থেকে 4 ফুট দূরে হলে, মাছির অবস্থানকে সংক্ষেপে (3, 4) বললেই হবে। এভাবে মাছিটি কখনো (1, 1), (2, 1.5), (3, 3) এরূপ বিভিন্ন জায়গায় অব্স্থান করতে পারে। খাতায় দেয়ালের কোণা, লাইন এঁকে দেখালে ডেকার্তের মাছিটি দেখাবে:

DescartesFly

ডেকার্তের নামানুসারে এর নাম কার্তেসীয় স্থানাংক ব্যবস্থা (Cartesian Coordinate System)। আয়তাকার বলে, একে আয়তিক স্থানাংক ব্যবস্থা (Rectangular Coordinate System)ও বলা হয়।

কার্তেসীয় ব্যবস্থায় কোনো বিন্দুর অবস্থান জানতে তুমি আনুভূমিক ও উলম্ব অক্ষ বরাবর দুটি দূরত্ব বের কর। পোলার স্থানাংক ব্যবস্থা (Polar Coordinate System) নামে আরেকটি স্থানাংক ব্যবস্থা আছে, যেখানে মূলবিন্দু থেকে কাঙ্ক্ষিত বিন্দুর সরাসরি দূরত্ব এবং সেটি কত কোণে আছে জানলেই চলবে। যেমন ধর, কার্তেসীয় স্থানাংক ব্যবস্থায় একটি বিন্দু (3, 4), অর্থাৎ বিন্দুটি মূলবিন্দু থেকে 3-ঘর ডানে, তারপর 4-ঘর উপরে অবস্থিত। পোলার স্থানাংকে সেটি মূলবিন্দু থেকে r দূরত্বে এবং অনুভূমিকের সাথে α কোণে হলে,

CartesianPolar

পীথাগোরাসের সূত্র প্রয়োগ করে পাও,

r^2 = 3^2 + 4^2

=> r^2 = 9 + 16

=> r^2 = 25

=> r = ±5

দূরত্ব যেহেতু ধনাত্মক, r = 5.

আর ত্রিকোণমিতির ট্যানজেন্ট সূত্র থেকে পাও,

tanα = 4/3

=> tanα = 1.33…

এখন ক্যালকুলেটরের সাহায্যে পাও, α = 53.1 ডিগ্রি (প্রায়)। অথবা চাঁদার সাহায্যেও কোণটি মাপতে পার।

সুতরাং কার্তেসীয়ে (3, 4) যে কথা, পোলারে (5, 53.1ডিগ্রি) একই কথা। এর মানে হলো, অনুভূমিকভাবে 3 ঘর, তারপর উলম্বভাবে 4 ঘর গিয়ে তুমি যেখানে পৌঁছবে, অনুভূমিকের সাথে প্রায় 53.1 ডিগ্রি কোণে 5 ঘর গেলে সেই একই বিন্দুতে পৌঁছবে। এভাবে কোণ আর দূরত্ব জানলেও তুমি যেকোনো জায়গা বের করে ফেলতে পার। এবার তাহলে আসি, আমাদের বিস্ময়কর গণিতবিদ মৌমাছির কথায়।

ভেক্টর গণিতজ্ঞ মৌমাছি

প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়ে অনুসন্ধানী (scout) মৌমাছি, উড়ে বেড়ায় এক ফুল থেকে আরেক ফুলে, যতক্ষণ না পর্যন্ত চমৎকার মানসম্পন্ন মধুর খোঁজ পায়। কাঙ্ক্ষিত ফুলের সন্ধান পাওয়ার পর আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ফিরে আসে মৌচাকে, অন্যদেরকে জানায় তার আবিষ্কারের কথা। প্রথমে সে বয়ে আনা মকরন্দটি (nectar) তাকে গোল হয়ে ঘিরে ধরা কর্মী মৌমাছিদের মুখের কাছে নিয়ে নিয়ে স্বাদ দেয়, এতে তারা বুঝতে পারে মধুর গুণাগুণ। মধুর গুণের ব্যাপারে অন্যদের আস্থা জন্মানোর পর, মধুর উৎসের সন্ধান দেয় সে, অদ্ভুত এক উপায়ে, যা দেখে অন্যরা (recruit) উৎসের দিকে তাদের অভিযান শুরু করে।

কোন পথে উৎসটি বিদ্যমান এটি জানানোর জন্য স্পন্দন নৃত্য (Waggle Dance) নামে এক ধরণের নাচ শুরু করে স্কাউট মৌমাছিটি। এতে মৌচাকের একটি স্থান থেকে শুরু করে, প্রথমে শরীর কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে নির্দিষ্ট দিকে সোজা একটু দূরত্ব অতিক্রম করে সে, তারপর অর্ধবৃত্তাকার পথে সূচনা বিন্দুতে ফিরে আসে, আবার সোজা পথে শরীর কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে পূর্বের দূরত্ব অতিক্রম করে, এবং অবশেষে বিপরীত দিক থেকে অর্ধবৃত্তাকার পথে ফিরে আসে—এভাবে বাংলা ৪-এর মত দেখতে বর্তনীপথ তৈরি করে। সঙ্গীদেরকে কয়েকবার সে এভাবে বর্তনী তৈরি করে দেখায়।

Waggle

মধুর উৎসের দিক

বর্তনীর সোজা পথটুকুর দিক থেকে মধুর উৎসের দিকের সন্ধান পাওয়া যায়।

FlowerField

যেমন, উপরের ছবির প্রথম মৌমাছিটির খাবারের উৎস সূর্যের দিকে, তাই সে মৌচাকে আসার পর তার নাচের সোজা পথটি হবে মৌচাকের নীচ থেকে খাড়া উপরের দিকে। খাড়া উপরের দিক মানে সূর্যের দিক।

দ্বিতীয় মৌমাছিটির খাবারের উৎস হলো মৌচাক থেকে যেদিকে সূর্য, তার সাথে ৯০ ডিগ্রি কোণে ডান দিকে। তাই মৌচাকে আসার পর এর নাচের সোজা পথটিও খাড়া উপরের দিকের সাথে ৯০ ডিগ্রি কোণে ডান দিকে হবে।

অন্যদিকে তৃতীয় মৌমাছিটির খাবারের উৎস হলো, যেদিকে সূর্য, তার সাথে ১৩৫ ডিগ্রি কোণে বাম দিকে। তাই এর নাচের সোজা পথটি হবে খাড়া উপরের দিকের সাথে ১৩৫ ডিগ্রি কোণে বাম দিকে।

Direction

“তার মানে সংবাদবাহক মৌমাছি প্রথমে সূর্যের দিকটি দেখে, তারপর তার সাথে খাবারের উৎস কত ডিগ্রি কোণে, কোন দিকে আনত তা হিসেব করে। এবং মৌচাকে আসার পর, খাড়া উপরের দিকটিকে সূর্যের দিক ধরে নিয়ে, কোণটিকে সেভাবে ডানে বা বামে সমন্বয় করে অন্যদের দেখায়। অন্যরা তখন প্রথমে সূর্যকে দেখে সেভাবে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে।” জেরিন বলে।

“হ্যাঁ।” স্মিত হেসে সায় দেই আমি।

মধুর উৎসের দূরত্ব

“তার মানে ফুলটি কোন দিকে আছে এটি বোঝা গেল, কিন্তু কত দূরত্বে আছে এটি কীভাবে বুঝবে?” জেরিনের প্রশ্ন।

“এটিও মজার। যদি ফুলটি দূরে হয়, তাহলে সোজা পথটি অতিক্রম করার সময় মৌমাছিটি বেশি সময় নিবে, কাছে হলে কম সময়। সোজা পথের সময় দেখে অন্যরা হিসেব করে নেয় কত দূরে খাবারের উৎস। একটি বিশেষ প্রজাতির মৌমাছির উপর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিটার দূরত্বের জন্য স্পন্দন নৃত্যের সময় ৭৫ মিলিসেকেণ্ড করে বেড়ে যায়। অন্য প্রজাতির ক্ষেত্রে ফলাফলটি ভিন্ন হতে পারে। তবে যেকোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে দূরত্বের সাথে সময়ের সর্বদাই একটি সুনির্দিষ্ট সরলরৈখিক সম্পর্ক (linear relationship) বিদ্যমান। নিচে তোমাদেরকে এশীয় এবং ইউরোপীয় দুটি মৌমাছি প্রজাতির ক্ষেত্রে দূরত্ব বনাম স্পন্দন নৃত্যের স্থায়িত্বকাল-এর সম্পর্ক দেখাচ্ছি ”

Apis

    1. এশীয় মৌমাছি Apis cerana cerana-এর দূরত্ব (x)বনাম সময় (y) রেখাঃ y=154+3.40x
    2. ইউরোপীয় মৌমাছি Apis mellifera ligustica-এর দূরত্ব (x)বনাম সময় (y) রেখাঃ y=165+1.92x

Su et el.

“আচ্ছা, বাবা, সূর্য তো সব সময় এক জায়গায় থাকে না। যদি মৌমাছিটির আসতে দেরী হয়, তখন তার নাচ দেখে অন্যরা বের হয়ে গেলে তারা দিক ভুল করে ফেলবে না?”

মেয়ের প্রশ্নে চমৎকৃত হই। “হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। প্রতি ৪ মিনিটে সূর্য ১ ডিগ্রি করে পশ্চিম দিকে সরতে থাকে। যদি অনুসন্ধানী (scout) মৌমাছিটির মৌচাকে আসতে বেশ সময় লাগে কিংবা মৌচাকে আসার অনেক পরে নাচ দেখায়, সূর্যের দিক পরিবর্তনের সাথে তার নৃত্য কোণটিও সেভাবে সমন্বয় করে নেয় সে, ফলে কোনো সমস্যা হয় না। এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা। এটি না ঘটলে পরবর্তী মৌমাছিদের (recruit) অনেকেই মারা যেত, কারণ ভুল পথে চলে যাবার কারণে বাসা থেকে যে খাবার নিয়ে তারা বের হতো, তা শেষ হয়ে যেত, এবং খাবারের কোনো উৎস খুঁজে না পাওয়ায় ক্লান্তিতে আর ফিরে আসতে পারত না। কিন্তু এরকম কখনো হয় না।”

“সত্যিই খুব অদ্ভুত তো! কিন্তু যদি আসার পথে মেঘে সূর্য ঢেকে যায়, তাহলে কি করবে?”

“অতিবেগুনি রশ্মি (ultraviolet rays) কাজে লাগিয়ে, মৌমাছি অন্ধকারেও সূর্যের অবস্থান বুঝতে পারে, মামণি।”

আমি চুপ করে তাকিয়ে থাকলাম মেয়েদের দিকে। গণিত নিয়ে আলোচনার শেষের দিকে তাদের চোখের সেই চিরায়ত মুগ্ধ বিস্ময়।

“এর পর মৌমাছি দেখলে,” আমি ধীরে ধীরে বলি, “নিশ্চয়ই গভীরভাবে স্মরণ করবে তাদের গাণিতিক গুণের কথা, উপহাস ভরে উড়িয়ে দেবে না নিছক ক্ষুদ্র প্রাণী বলে। জগতে সবারই নিজের মত করে রয়েছে জ্ঞান, এ উপলব্ধি যখনই আসবে তোমার, তা শ্রদ্ধা জাগাবে জগতের অপার রহস্যের প্রতি, সৃষ্টি করবে সহনশীলতা আর সৃষ্টিজগতের প্রতি মমতা। এবং অবশ্যই সে সময় তোমার কৃতজ্ঞতা জানাবে মহান সেই গণিতবিদের প্রতি যিনি মৌমাছির ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে স্থাপন করে দিয়েছেন বিস্ময়কর এই জ্ঞান।”

[সংক্ষেপিত সংকলিত]

__________________________________

তোমার প্রভু প্রত্যাদেশ দিলেন মৌমাছিকে “নিবাস গড়ে তোল তোমরা পাহাড়ে এবং বৃক্ষে, এবং সেসব স্থাপনায় যা নির্মাণ করে মানুষ। অতঃপর খাও ফলসমূহ থেকে এবং গমন কর প্রভুর নির্ধারিত পথ ধরে, যা সুগম করা হয়েছে তোমাদের অনুসরণের জন্য।”

এদের উদর হতে নির্গত হয় এক পানীয়, বিচিত্র তার বর্ণ, যাতে রয়েছে মানুষের রোগমুক্তি। নিঃসন্দেহে চিন্তাশীলদের জন্য এতে রয়েছে নিশ্চিত নিদর্শন।—আল কুরআন, সুরা আন-নহল: ৬৮-৬৯

About ম্যাভেরিক

23 comments

  1. ম্যাভেরিক ভাই,অনেক ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা লেখা পোস্ট করার জন্য।

  2. ভাল…………আপনার কাছ থেকে আরো সুন্দর সুন্দর বিষয় জানতে পারব বলে আশা করি………………ধন্যবাদ…………

  3. আমার মনে হয়, যে ব্যাপারটা প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়মে ব্যাখ্যা করে ফেলা যায়, সেখানে স্রষ্টাকে নিয়ে আসা শুধু অবান্তর ও নিষ্প্রয়োজনই নয়, বরং জ্ঞানচর্চার পক্ষে নিতান্ত ক্ষতিকর।

    • স্রষ্টা নিয়ে আসা জ্ঞানচর্চার পক্ষে ক্ষতিক্ষর, এ শিক্ষা আমি নিউটন, ডেকার্তে, লিবনিটজ, অয়লার, কিংবা রামানুজনের কাছ থেকে পাইনি। বরং তাঁদের অবদানে উল্টোটাই পেয়েছি।

      ভালো কাটুক সময়।

    • ম্যাভেরিক, আপনার জবাবটাতে একটা logical fallacy আছে যার নাম appeal to authority. বিখ্যাত অনেক বিজ্ঞানীই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু মনে রাখতে হবে, তাঁরা কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণে ঈশ্বরের ধারণা ব্যবহার করেননি কেননা তা যে বিজ্ঞানসম্মত নয় সেটা তাঁদের বিশ্বাস সত্বেও তাঁরা ভালোই জানতেন। কখনো যদি তাঁদের বিজ্ঞান বিষয়ক লেখায় ঈশ্বরের কথা এসেও পড়ে তা নেহায়েতই শৈল্পিক আঙ্গিক বজায় রাখার খাতিরে, ধর্মের সাথে জোর করে মিল দেখানোর চেষ্টা তাঁদের মধ্যে ছিল না। যদি এমনটা তাঁরা করতেন তবে কখনোই প্রথাবদ্ধতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে নতুন তত্ত্ব উপহার দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হতো না। তাছাড়া, ঈশ্বরে বিশ্বাস একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, এতে আপত্তি করার কোনো অধিকার আমার নেই। আমি শুধু বলতে চাই, বিখ্যাত অনেক বিজ্ঞানীই ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন বলে সেটা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে – এমন ভাবা ভুল। বিজ্ঞানীরা নবী বা পয়গম্বর নন যে তাঁদের প্রতিটা কথা, ধারণা ও বিশ্বাসকে অভ্রান্ত ভাবতে হবে। বিজ্ঞানীদের পুজা নয়, শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে।

    • logical fallacy, appeal to authority! আমার মন্তব্য পুরোটা একসাথে পড়ুন, সৌমিত্র:
      “স্রষ্টা নিয়ে আসা জ্ঞানচর্চার পক্ষে ক্ষতিক্ষর, এ শিক্ষা আমি নিউটন, ডেকার্তে, লিবনিটজ, অয়লার, কিংবা রামানুজনের কাছ থেকে পাইনি। বরং তাঁদের অবদানে উল্টোটাই পেয়েছি।” আপনি বললেন, জ্ঞানচর্চায় স্রষ্টাকে নিয়ে আসা ক্ষতিকর, যদিও এর সপক্ষে অপনি কোনো “যুক্তি” দেননি; আমি কিছু “উদাহরণ” দিলাম, যাঁদের জ্ঞানচর্চায় স্রষ্টার ধারণা বরং সপক্ষে কাজ করেছে। আপনি এতে দুটি কঠিন সংজ্ঞা দিলেন: “logical fallacy আছে যার নাম appeal to authority”, যদিও যুক্তিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞদের মতামত/উদাহরণ নেয়া অগ্রহণযোগ্য নয়।
      এছাড়া, appeal to authority-এর মানেই এই নয় যে, এটি তাৎক্ষণিকভাবে fallacy এবং অগ্রহণযোগ্য। একে fallacy প্রমাণ করতে আপনাকে ২টি’র একটি কাজ করতে হবে: (১) প্রমাণ করতে হবে, উক্ত authority আসলে এ বিষয়ে authority নন, অথবা (২) তিনি এ বিষয়ে আসলেই authority, কিন্তু এ বিষয়ে আরো অনেক authority আছেন যারা আবার ভিন্নমত পোষণ করেন।

      এক্ষেত্রে, আমার কথাটিকে fallacy প্রমাণ করতে আপনি (২)-এর আশ্রয় নেবেন, এবং হয়তো এমন কিছু বিশেষজ্ঞের কথা বলবেন যারা বিজ্ঞানে স্রষ্টার ধারণাকে ক্ষতিকর বলবেন (অর্থাৎ যে “যুক্তিটি” আগে দেননি, তা এখন দেবেন)। মজার ব্যাপার হলো, এতে বরং আপনিই আবার appeal to authority “fallacy”-এর ফাঁদে পড়বেন, কারণ নিউটন, ডেকার্তে, লিবনিটজ, অয়লার, কিংবা রামানুজনের উদাহরণগুলো থাকছেই। এছাড়া বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে ঈশ্বরের ধারণা ব্যবহার করা হয় না, এ ঠিক নয়। নিউটনের একটি কথা বলছি: “Gravity explains the motions of the planets, but it cannot explain who set the planets in motion. God governs all things and knows all that is or can be done.”

      যা-ই হোক, আমি আমি জানি, বিজ্ঞানে why এবং how এক জিনিস নয়; এবং প্রসঙ্গক্রমে ঈশ্বর আসতেই পারেন, এবং আমিও এনেছি ঐটুকুই।

      সবশেষ কথা হলো, লেখাটি আমি লিখেছি মমতায়, এবং নিঃসন্দেহে কারু ক্ষতি করার জন্য নয়–অন্তত বেশির ভাগ পাঠকই আমার সাথে একমত হবেন। বিরুদ্ধ মত থাকতেই পারে, কিন্তু বিরুদ্ধ মতকে আমি কখনো অবান্তর, নিষ্প্রয়োজন, বা ক্ষতিকর বলি না, অন্তত: কোনো প্রমাণ না দিয়েই।

  4. ধর্মের সাথে জোর করে মিল দেখানোর চেষ্টাকে আর যাই হোক, বিজ্ঞানসম্মত বলা চলে না। আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না, শুধু এটাই বলবো, যুক্তি আর পাল্টাযুক্তির খেলা অনন্তকাল চলতে পারে উপরের ব্যাপারটা নিয়ে, যদি কিনা বিজ্ঞানের দর্শনগত দিকটিতে ত্রুটি থাকে। আমাদের উপমহাদেশে এই সমস্যাটি বেশ প্রকট। লেখকের লেখা ও মন্তব্যগুলো তারই পরিচয় বহন করে।

    • “যুক্তি আর পাল্টা যুক্তির খেলা” অনন্তকাল চলবে কিভাবে?

      Formal Logic নিয়ে আপনাকে আরো পড়াশুনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনি প্রথমে দিলেন “Conclusion without Premise”! তারপর কেউ আপনার Conclusion’কে Weaken করতে চাইলে, আপনি হঠাৎ সেটি Appeal to Authority বললেন। এখানে Formal Logic-এ আরেকটি ভুল করলেন, কারণ প্রথম ব্যক্তির যুক্তি, যাতে কোনো premise-ই নেই, খণ্ডনে দ্বিতীয় ব্যক্তি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বিপরীত উদাহরণ দিলে, সেই বিপরীত উদাহরণকে Appeal to Authority বলা যায় না। কাজেই আপনার তথাকথিত যুক্তির Infinite Loop এখানে অবান্তর। আমার আগের মন্তব্যে কেবল এটিই তুলে ধরেছি, Formal Logic-এর প্রসঙ্গে আপনি বরং নিজেই নিজের fallacy-এর ফাঁদে পড়েছেন।

      আমার মতামত গ্রহণে যেমন আপনার দায়বদ্ধতা নেই, তেমনি আমার লেখায় আমি কী লিখব, সেটি আমার নিজস্ব ব্যাপার; তবে যুক্তির খেলায় যুক্তি নিয়ে আসবেন, এ-ই কাম্য। পিছু হটে ব্যক্তি আক্রমণ প্রতিক্রিয়াশীলদের কাজ, বিজ্ঞানমনষ্কদের নয়। এই পোস্টটি বিভিন্ন ফোরামে কয়েক হাজার বার পড়া হয়েছে, কয়েক শত মন্তব্য এসেছে, পজেটিভ রেটিং এসেছে, কিন্তু কেউ আপনার মতো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলেনি। আপনি কি আমার সে পাঠকদের প্রসঙ্গ Appeal to Authority বলবেন? বলুন, আপনার ইচ্ছে, যত খুশি, আমিও তবে বধির হয়ে যাই। ধন্যবাদ।

  5. onk shundor..akta post..r Mr. Shoumitro,Sristykorta Boba prani der akta odvut khomota diye rekhesen..aita apni manen r na manen..tader karjo kolapei ta prokash pay

Leave a Reply

Scroll To Top