Home / অন্যান্য / ভয়ঙ্কর সারাসিন জাদু

ভয়ঙ্কর সারাসিন জাদু

King Lear: What can you say to draw? A third more opulent than your sisters? Speak.
Cordelia: Nothing, my lord.
King Lear: Nothing!
Cordelia: Nothing.
King Lear: Nothing will come of nothing: speak again.

ফিরানযা নগরীর বেঞ্চিতে

ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনাকাল।
আর্নো নদীর তীরে ফিরানযা শহরের বেঞ্চিগুলিতে জমায়েত হয়েছেন নগরসংঘের বণিকগণ। ফিরানযার ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির পেছনে বেঞ্চিগুলির অবদান বিশাল। আফ্রিকা থেকে বয়ে আনা সোনা, রূপা ও ক্রীতদাস, এশিয়ার রেশম, কার্পেট, মশলা ও চিনামাটি, পবিত্র ভূমির ধান, তুলা ও প্রসাধন, বাগদাদের কাঁচ, ইংল্যান্ডের পশম, কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কাঠ, যাবতীয় পণ্যদ্রব্যের হিসেব–নিকেশ, লেনদেন এদের উপরই হয়ে থাকে। রাজ্যের উন্নয়নে, যুদ্ধবিগ্রহের খরচে সামন্তপ্রভু, রাজা, এমনকি সম্রাটগণও হাত পাতেন এখানে।

প্রতি মাসে একবার বেঞ্চিগুলিতে জমায়েত হন বণিকগণ, অনুমোদন করেন মাস শেষের হিসেব। মাঝেমাঝে হিসেবরক্ষণ পদ্ধতির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন তারা—একঘরা নগদান বহিকে দুঘরায় পরিণত করলে উপকার হবে কি, মুদ্রা হিসেবে রৌপ্যদণ্ডের পরিবর্তে স্বর্ণচাকতির প্রচলন কতটা সফল হবে?

আজকে অবশ্য তারা জড়ো হয়েছেন বিশেষ কারণে। তিন মাস আগে কোত্থেকে এক বিদেশি এসে হাজির হয়েছে ফিরানযার মাটিতে, নতুন এক ধরণের গণিতের কথা বলে বেড়াচ্ছে জনে জনে। শুধু তাই নয়, সে এখন কিশোর ও তরুণদের শেখাচ্ছে গণিতটির নিয়মকানুন, শেখাচ্ছে ছোটখাট ব্যবসায়ীদের। ফিরানযার গণিত ও হিসেবরক্ষণ ব্যবস্থায় বেশ বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে নয়।

প্রৌঢ় লোকটিকে আনা হলো বণিকদের সামনে, পেছন পেছন আসলো কিশোরদের একটি দল। মজার কাণ্ড হবে ভেবে জুটে গেল আরও কিছু লোক, বেশ একটি জটলার সৃষ্টি হলো জলপাই গাছটির নিচে।

একদৃষ্টিতে লোকটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন বণিকগণ। একসময় নীরবতা ভাঙেন জিওভান্নি, প্রশ্ন করেন, “কী নাম আপনার?”
“জ্বি, হারমান—হারমান ভন স্যাক্সন,” অস্বস্তিভরে জবাব দেন প্রৌঢ়।
“পিতার নাম? নিবাস কোথায় আপনার?”
“আমার পিতার নাম ভিলহেলম ভন স্যাক্সন। জার্মানির স্যাক্সনি অঞ্চলে একদা নিবাস ছিল আমার।”

সন্দেহে ক্ষুদ্র হয়ে আসে বণিকদের চোখ। “একদা কেন, পিতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন নাকি?” শ্লেষভরে প্রশ্ন করেন লরেঞ্জো।
ম্লান হাসেন হারমান, “না, তা নয়, তবে দেশ ছেড়েছি আমি অনেক অনেক বছর আগে, সেই কৈশোরে।”
“ইটালিতে আপনার আগমন কীভাবে, কোত্থেকে?” প্রশ্ন ছুঁড়েন নিকোলো।
“আমার কাহিনী আপনাদের সামনে বর্ণনা করার অনুমতি প্রার্থনা করছি, মহাশয়গণ।”
“আচ্ছা, সংক্ষেপে বলুন,” বিরক্তভরে বলেন জিওভান্নি। সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চেপে ধরাই উদ্দেশ্য ছিল তার, তবু দেখা যাক, কোনো তথ্য বের হয় কি না।

গণিতবিদ হারমানের কাহিনী
“পবিত্র রোমান জার্মান সাম্রাজ্যের নিম্ন স্যাক্সনি অঞ্চলে জন্ম আমার। আমার বাবা ছিলেন লবণের সওদাগর, স্যাক্সনি থেকে পুবে বাল্টিক সাগরের দিকে যে লবণপথটি গমন করেছে, তাতে বাণিজ্য করে ঐশ্বর্য লাভ করেছিলেন তিনি। আমার চার বছর বয়সেই মারা গিয়েছিলেন মা, বাবার সঙ্গে বাণিজ্যে ঘুরে ঘুরেই বড় হতে থাকি আমি। কিন্তু হঠাৎ একদিন গুটিবসন্তে বাবাও চলে যান পরকালের পথে, নিতান্তই এক কিশোর আমি তখন। ঐশ্বর্য ক্ষণস্থায়ী, তার চেয়েও ক্ষুদ্র জীবন আমাদের! বাবার মতো লবণপথ মাড়াতে ইচ্ছে করল না আর, স্যাক্সনি ছেড়ে চলে গেলাম গলের নরম্যান্ডি অঞ্চলে, আত্মনিয়োগ করলাম যীশূর সেবায়। ঘুরতে থাকলাম মঠের পর মঠ, দুর্গের পর দুর্গ, ধর্মশাস্ত্রের পাশাপাশি শিখতে লাগলাম যুদ্ধবিদ্যার কলাকৌশল।

ইউরোপ জুড়ে ক্রুসেডের দামামা, দলে দলে বীরগণ যাত্রা করছে পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে। টগবগ করছে রক্ত আমারও, সত্তর জন নরম্যান বীরের একটি দলে ঢুকে গেলাম একদিন। লেভান্তের মরুতে যুদ্ধ করব আমরা সারাসিনদের বিরুদ্ধে।

দক্ষিণ গল থেকে প্রথমে আল্পস পর্বতমালা অতিক্রম করে ইটালি গমন করি আমরা, লোম্বার্ডির সমভূমি পেরিয়ে পৌঁছি জেনোয়া নগরে। জেনোয়ায় একটি গ্যালিতে আরোহণ করি আমরা, ইটালির উপকূল ধরে অগ্রসর হতে থাকি দক্ষিণে, মেসিনা প্রণালী পেরিয়ে পৌঁছে যাই আয়োনীয় সাগরে। তারপর সোজা ক্রিট দ্বীপ, কিছুদিন যাত্রাবিরতি করি সেখানে। অবশেষে একদিন পবিত্র ভূমিতে পৌঁছে আমরা, যোগদান করি জেরুজালেম রাজ্যের রাজা প্রথম আমালরিকের সৈন্যদলে।

স্যাক্সনি থেকে যে পথে পবিত্রভূমিতে গমন করেছিলেন হারমান

লেভান্তে বিক্ষিপ্ত ছোটখাট কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি আমি, কিছু সুনামও যে অর্জন করিনি তা নয়। তবে প্রথম বড় বাধাটির মুখোমুখি হই আমরা মিশরে, গিজার পিরামিডগুলোর ঠিক পেছনে, নীলনদের তীরে। আমালরিকের বাহিনীর সঙ্গে অগ্রসর হতে গিয়ে এক রাতে খাদে পড়ে মারা যায় আমার ঘোড়া, বেশ আহত হই আমি। স্যাক্সনি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে সাহারার বুকে হিমশীতল মৃত্যুর অপেক্ষায় ধুঁকতে থাকি আমি, মাথার উপর পাক খায় সাহারা শকুনের দল। তৃতীয় দিন সকালে সারাসিনদের দ্রুতগামী উষ্ট্রবাহিনীর একটি দল আবিষ্কার করে আমাকে, নিয়ে যায় তাদের নেতা সালাদীনের কাছে।”

বিস্ময়ের শোরগোল শোনা যায় জনতার মাঝে।
“রক্তলোলুপ বর্বর সালাদীনের কথা বলছেন, হাতিন-এর যুদ্ধের পর রেনল্ড ডি শ্যালিয়নকে যিনি স্বহস্তে শিরশ্ছেদ করেছেন?” তীক্ষ্ণ হয় জিওভান্নির কণ্ঠস্বর।
“বেয়াদবি মাফ করবেন,” নম্র অথচ দৃঢ়ভাবে বলেন হারমান, “যে মঞ্চে রেনল্ডকে শিরশ্ছেদ করেন সালাদীন, সে মঞ্চেই বুকে টেনে ধরেছিলেন জেরুজালেমের রাজা গী দ্য লুজিনিওকে, মুক্ত করেও দিয়েছেন তাকে। এ এক অনন্য ইতিহাস, মহাশয়গণ, তবে সালাদীনকে সবসময়ই আমি দেখেছি সত্যনিষ্ঠ, এবং সত্যি বলতে কী, আমাদের সিংহহৃদয় রিচার্ড, পরাক্রমশালী ফিলিপ, কিংবা বয়স্য বার্বারোসার চেয়েও তার বীরত্ব উজ্জ্বলতর; মহানুভবতায়ও ধর্মযুদ্ধের সকল বীরদের সেরা তিনি। আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন, সিংহহৃদয় প্রকাশ্য শত্রু ছিলেন সালাদীনের, অথচ যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁরই জ্বরে অঞ্চলের সেরা ফল ও সুপেয় পানি পাঠিয়েছিলেন সালাদীন, যুদ্ধে সিংহহৃদয়ের অশ্ব নিহত হলে সেরা আরবীয় অশ্বও পাঠিয়েছেন তাঁর জন্য।”

হারমানের বর্ণনায় স্পষ্টতঃই অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন বণিকগণ। একমনে বলে যেতে থাকেন হারমান, “আমাকে সুস্থ করে তুলেন সালাদীনের চিকিৎসকগণ। তারপর সালাদীন মুক্ত ঘোষণা করেন আমাকে। যুদ্ধের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা এসে গেছে ততোদিনে, কিন্তু সমগ্র লেভান্ত জুড়েই চলছে রণদামামা, নিরাপদ নয় কোনো অঞ্চল, তাই সালাদীনের বাহিনীর সঙ্গে থেকে যাওয়াই মনঃস্থির করি আমি।

তিন যুগেরও অধিককাল সময় কাটাই আমি সারাসিনদের সাথে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধেও এমনও সময় আসে কখনো কখনো, যখন থেমে যায় অস্ত্রের ঝনঝনানি, স্তিমিত হয় অশ্বের হ্রেষারব, শোনা যায় না আহতের আর্তনাদ—নীরব নিথর হয় পারাপার। আর তখন তাবুর ম্লান আলোতে সারাসিনদের কাছে নতুন এক ধরণের গণিত শিখি আমি, শিখতে থাকি চারশ বছর আগে মহান আল-খোয়ারিজমি গাণিতিক যেসব কানুনের কথা বলে গেছেন। আল-খোয়ারিজমির পদ্ধতি অনুসরণ করার দরুণ গণিতশাস্ত্রে আমি একজন অ্যালগোরিস্ট।

এই তাহলে নতুন গণিতের কাহিনী! বর্ণনায় বাধা দেন জিওভান্নি, “আপনার বিরুদ্ধে নগরীর অধিবাসীদের কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিদেশি হয়েও ফিরানযার মাটিতে আমাদেরই পবিত্র রোমান গণিতের বিরুদ্ধে নতুন অস্পৃশ্য এক গণিত চালু করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আপনি। আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার, আপনি তা এনেছেন প্রাচ্যদেশীয় বর্বর সারাসিনদের কাছ থেকে, যাদের বিরুদ্ধে পুরো ইউরোপ পবিত্র ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত আজ। এ ছাড়া ফিরানযার দক্ষ গণিতজ্ঞগণ ইতোমধ্যে আপনার গণিত পরীক্ষা করে দেখেছেন; তারা একমত প্রাচ্যদেশীয় এ গণিত আসলে এক ধরনের জাদুটোনা, ভোজবাজি।”

“না, মহাশয়গণ, মোটেও ভোজবাজি নয় এ গণিত, বরং সরল সুশৃঙ্খল অথচ শক্তিশালী নিয়ম এক, যা রোমান পদ্ধতির চেয়ে সহজ বহুগুণে, যার সাহায্যে যোগ-বিয়োগ এবং গুণ-ভাগের গাণিতিক কাজ আপনারা করতে পারবেন অধিকতর দ্রুতগতিতে, কয়েক মুহূর্তে। অ্যাবাকাসের মতো গণনাকারী যন্ত্রের প্রয়োজন নেই এতে; নলখাগড়ার একটি কলম ও এক টুকরো কাগজ, অথবা বাঁশের একটি কঞ্চি ও ভূমির উপর একটু জায়গা, কিংবা এমনকি মনে মনেও নানা হিসেব করে ফেলতে পারবেন এর সাহায্যে।
“তাই নাকি! বলুন দেখি আপনার শক্তিশালী গণিতের কথা।” নিকোলোর স্বরে স্পষ্টই খোঁচা।

প্রাচ্যদেশীয় গণিতের কাহিনী
পায়ের কাছে পড়ে থাকা জলপাইয়ের মৃত ডালটি তুলে নেন হারমান, তারপর ঝুঁকে দ্রুত মাটির উপর আঁকতে থাকেন। “প্রাচ্যদেশীয় গণিতে, যার উদ্ভাবন প্রাচীন ভারতে, সংখ্যা লিখতে নয়টি প্রতীক ব্যবহার করা হয়। প্রতীকগুলো হচ্ছে ১, ২ , ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯। ১ হচ্ছে এক, ২ হচ্ছে দুই, এভাবে ৯ হলো নয়”।”

কৌতুকের হাসি হাসেন জিওভান্নি, “আপনি বলতে চাচ্ছেন, দশ লিখবেন নতুন আরেকটি প্রতীক দিয়ে, এগারো লিখতে আরও একটি, এভাবে একশত লিখতে শততম প্রতীক মুখস্ত করতে হবে! এ তো দেখছি আদিম যুগের টালি পদ্ধতির চেয়েও খারাপ। আপনার কি মনে হয় না টালির যুগই শেষ করে এসেছি আমরা কয়েক শতাব্দি পূর্বেই, আমাদের যুগ রোমান সংখ্যার যুগ?”

হারমান: না, এ নয়টি প্রতীক এবং সিফর নামের গোলাকার এ প্রতীকটি • দিয়ে মহাবিশ্বের সকল সংখ্যাই লিখে ফেলা যায়।
জিওভান্নি: নয় পর্যন্ত লিখতেই তো নয় ধরণের প্রতীক ব্যবহার করে ফেলেছেন আপনি, যেখানে আমরা ব্যবহার করি মাত্র তিন ধরণের প্রতীক: I V X। তারপরও বলছেন, আর কোনো প্রতীক লাগবে না আপনার। দয়া করে, মহাশয়, আপনার জাদুবিদ্যাটি ব্যাখ্যা করে আমাদের ধন্য করবেন কি?
হাসির রোল উঠে জনতার মধ্যে।

হারমান: জ্বি, বলছি। রোমান পদ্ধতিতে একটি প্রতীক সংখ্যার যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, তার মান কখনো পরিবর্তিত হয় না। এ পদ্ধতিতে I মানে এক; II মানে এক ও এক, অর্থাৎ দুই; এমনিভাবে III হচ্ছে এক, এক ও এক, অর্থাৎ তিন। কিন্তু প্রাচ্যদেশীয়গণ, পূর্বেই বলেছি, এক লিখে থাকে এভাবে: ১ …
জিওভান্নি: এ আর নতুন কী! চিহ্নটিই কেবল অন্যরকম যা, কিন্তু ময়ূরের পুচ্ছ ধারণ করলেই কাক তো আর ময়ূর হয়ে গেল না।
হারমান: না, প্রাচ্যদেশীয় পদ্ধতিতে ১১ মানে রোমানের মতো দুই নয়। এখানে বামদিকে প্রতি ঘরের জন্য প্রতীকের মান দশ গুণ হয়ে যায়। কাজেই ১১ মানে এক ও এক নয়, বরং এক দশ ও এক, অর্থাৎ এগার। এমনিভাবে ২৫ হচ্ছে দুই দশ ও পাঁচ তথা পঁচিশ।

লরেঞ্জো: তারমানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, সংখ্যাটি যদি ৫২ হয়, তাহলে তার মান দাঁড়াবে পাঁচটি দশ এবং দুই, মানে সর্বমোট বায়ান্ন?
হারমান: জ্বি, জনাব, ঠিক তাই। ডান দিক শুরু করে,
প্রথম ঘরে যে প্রতীক, সংখ্যাটিতে তার মানও তাই থাকবে।
দ্বিতীয় ঘরে যে প্রতীক, সংখ্যাটিতে তার মান প্রতীকের দশ গুণ ধরতে হবে।
তৃতীয় ঘরে যে প্রতীক, সংখ্যাটিতে তার মান প্রতীকের একশত গুণ ধরতে হবে।
চতুর্থ ঘরে যে প্রতীক, সংখ্যাটিতে তার মান প্রতীকের এক হাজার গুণ ধরতে হবে।

এভাবে প্রতি ঘরের জন্য প্রতীকের মান আগের ঘরের দশ গুণ করে বড় হতে থাকবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, স্থানে স্থানে দশ গুণ

জিওভান্নি: পাঁচশত আটাত্তর কীভাবে লিখবেন আপনি? সাত হাজার তিনশত পনেরই বা কীভাবে?
হারমান: পাঁচশত আটাত্তর হচ্ছে, পাঁচ একশ সাত দশ ও আট, সুতরাং সংখ্যাটি ৫৭৮। এমনিভাবে সাত হাজার তিনশত পনের হচ্ছে ৭৩১৫। আসলে বিষয়টি খুব সরল: আপনি শুধু সংখ্যাটি একক, দশক, শতক, সহস্র, দশ সহস্র (অযুত), দশ অযুত (লক্ষ), দশ লক্ষ (নিযুত), … এভাবে ভেঙে ফেলবেন। তারপর যথাস্থানে সংশ্লিষ্ট প্রতীকটি বসিয়ে ফেললেই হবে।

কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হন জিওভান্নি। তারপর বলেন, “আপনি বলেছেন দ্বিতীয় ঘরের প্রতীকের মান দশগুণ?”
হারমান: জ্বি, মহাশয়।
জিওভান্নি: দশ মানে একটি দশ, আর কিছু নাই। তাহলে দশকে কীভাবে লিখবেন? দ্বিতীয় ঘরে ১ বসানোর পর প্রথম ঘরে তো আর কিছুই বসাতে পারবেন না (১ ?), কারণ তাতে সংখ্যাটি দশের চেয়ে বড় হয়ে যাবে।

জিওভান্নি দ্রুত ব্যাপারটি ধরতে পেরেছে দেখে খুশি হন হারমান, “যথার্থ বলেছেন, মহোদয়। যা কিছুই না, তার জন্য আমরা অ্যালগোরিস্টরা ফোঁটার মতো এ প্রতীকটি বসাই, •, যার নাম সিফর, অর্থ শূন্য। সুতরাং দশ হচ্ছে ১ •; এমনিভাবে ১ • • হচ্ছে একশত।

নতুন গণিতের কিছুটা বুঝতে পারেন জিওভান্নি, কিছুটা থেকে যায় ধাঁধাঁর মতো। “তা, আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনার রহস্যময় গণিত রোমান পদ্ধতির চেয়ে দ্রুততর?”
“জ্বি, মহাশয়,” হারমানের কণ্ঠে বিনয়ের আভাস।

“আগামী রবিবারের পরের রবিবার বিকেল তিনটার সময় জলপাই গাছের নিচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, অ্যালগোরিস্ট বনাম অ্যাবাসিস্ট। অ্যালগোরিজমের প্রতিনিধিত্ব করবেন আপনি, আমাদের পক্ষ থেকে থাকবে একজন।” ঘোষণা করে দেন জিওভান্নি।

হঠাৎ ঘোষণায় অস্বস্তি বোধ করে হারমান। ঘটনা এত দূর গড়াবে আশা করেননি তিনি। শখের কারণে প্রাচ্যদেশীয় গণিত ভালো লাগলেও পেশাজীবি দক্ষতা তার নেই এতে, কিন্তু পিছিয়ে আসার উপায় নেই এখন আর।

অ্যালগোরিস্ট বনাম অ্যাবাসিস্ট গণিতদ্বন্দ্ব
ফিরানযার বিখ্যাত অ্যাবাসিস্ট বার্তোলোমিউ, মানুষ তাকে ফিরানযার গণনযন্ত্র হিসেবেই চেনে বেশি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ গণিতবিদ, উত্তরে লোম্বার্ডি থেকে দক্ষিণের সিসিলি পর্যন্ত অ্যাবাকাসের খেলায় বহু মানুষকে হারিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। যে সময়ের কথা বলছি, বার্তোলোমিউ তখন অদ্রিয়াতিক সাগর তীরে ভেনিস বন্দরে অবস্থান করছিলেন। ফিরানযার বণিকগণ দ্রুত এক অশ্বারোহী বাহিনী পাঠালেন বার্তোলোমিউকে আনতে, এক সপ্তাহ পর ফিরলেন তিনি।

রবিবার, প্রতিযোগিতার দিন। জলপাই গাছের চারপাশ থেকে শুরু করে আর্নো নদীর তীর পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছে। এত দিন তারা দেখে এসেছে নিজেদের মাতৃভূমিতে অ্যাবাকাস-অ্যাবাকাসের দ্বন্দ্ব। কিন্তু আজকের লড়াই অন্যরকম, ভিন্ন দুই অঞ্চলের গণিতের লড়াই এটি, এ লড়াই প্রাচ্যের সারাসিনদের সঙ্গে ইউরোপের লড়াই।

প্রতিযোগিতার নিয়ম ঘোষণা করেন পরিচালক। ব্যবহারিক গণিতের চারটি সমস্যা দেয়া হবে, সমস্যাগুলো যিনি দ্রুততর সমাধান করতে পারবেন তিনিই হবেন বিজয়ী।

খানিকটা দূরে মুখোমুখি বসেন হারমান ও বার্তোলোমিউ। হারমানের হাতে পাখির পালকের কলম, কালির দোয়াত ও কাগজ; বার্তোলোমিউ নিয়ে এসেছেন তার অ্যাবাকাস। শুরু হলো প্রতিযোগিতা:

প্রথম সমস্যা
জেরুজালেম রাজ্যে নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটেলার মিলে মোট দুই হাজার পাঁচশত তেতাল্লিশ জন বীর অবস্থান করছে। ইউরোপ থেকে তাদের সঙ্গে আরও চার হাজার তিনশত আশি জন বীর যোগদান করল। জেরুজালেমে মোট বীরের সংখ্যা এখন কত?

ধাতব গুটির সাহায্যে দ্রুত সংখ্যাদুটি সাজিয়ে ফেললেন বার্তোলোমিউ তার অ্যাবাকাসের দুপাশে।

কলম দিয়ে হারমানও লিখে ফেলেন সংখ্যাদুটি এক টুকরো কাগজে।
২,৫৪৩
+ ৪,৩৮০
————-
=
ডানপাশের গুটিগুলো বামপাশে ঠেলে দেন বার্তোলোমিউ।

তারপর কোনো দাগে পাঁচটি গুটি থাকলে সেগুলো সরিয়ে দাগের উপরের ফাঁকা জায়গায় একটি গুটি, আর দাগহীন ফাঁকা জায়গায় দুটি গুটি থাকলে তা সরিয়ে ঠিক উপরের দাগে একটি গুটি বসাতে লাগলেন।

দোয়াতে পালক ভিজিয়ে হারমানও হিসেব করতে থাকেন
২,৫৪৩
+ ৪,৩৮০
————-
=___২৩

বার্তোলোমিউর চূড়ান্ত হিসেবটি দাঁড়াল নিচের ছবির মতো:

ছয় হাজার নয় শত তেইশ, প্রায় একসঙ্গে ফলাফলটি উচ্চারণ করেন বার্তোলোমিউ এবং হারমান, সুস্পষ্ট মীমাংসা হয় না প্রথম সমস্যার সমাধানে।

দ্বিতীয় সমস্যা
দক্ষিণ নরওয়ের অধিবাসীদের কাছ থেকে আট হাজার দুইশত চারটি কাঠের গুড়ি ক্রয় করে ফ্রান্সেসকো পরিবার। পণ্যগুলি ইতালিতে নিয়ে আসার সময় ভাইকিংদের আক্রমণে দুই হাজার নয়শত ত্রিশটি কাঠের গুড়ি ফ্ল্যান্ডারস উপকূলে উত্তর সাগরে তলিয়ে যায়। অবশিষ্ট গুড়ি ফিরানযায় পৌঁছলে, তাদের সংখ্যা কত ছিল?

নিজ নিজ লিখনযন্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হন হারমান ও বার্তোলোমিউ।
৮,২০৪
– ২,৯৩০
————
=

নির্দেশ পাবার সঙ্গেসঙ্গে বড় সংখ্যাটিতে অর্থাৎ বামপাশে উপর থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় দাগের প্রান্তের গুটি দুটিকে [ছবির লাল রঙের গুটি দুটি] সমতুল্য পরিমাণে নিম্নতর গুটিতেসাজিয়ে নেন বার্তোলোমিউ।

তারপর দুপাশের গুটি দ্রুত কাটাকাটি করতে থাকেন। এক মুহূর্ত পর দুজন আবারও একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠেন: পাঁচ হাজার দুই শত চুয়াত্তর।

৮,২০৪
– ২,৯৩০
———–
= ৫,২৭৪

তৃতীয় সমস্যা
একটি যুদ্ধাশ্ব ক্রয় করতে তেইশটি রৌপ্যদণ্ডের প্রয়োজন হলে,একশত সাতাশটি যুদ্বাশ্ব ক্রয় করতে কতটি রৌপ্যদণ্ডের প্রয়োজন?

এবার তিন ভাগ হয় বার্তোলোমিউর অ্যাবাকাস। বামপাশে বসে তেইশ-এর গুটি, মাঝখানে একশত সাতাশের গুটি, আর ডানপাশে বসবে গুণফলটি।

বামপাশের নিচের গুটি তিনটি দিয়ে প্রথমে মাঝখানের সবগুলো গুটিকে গুণন করেন বার্তোলোমিউ, গুনফলের গুটিতে ভরে উঠে ডানপাশ। অর্থাৎ একশ সাতাশকে তিন দিয়ে গুণ করলেন হারমান।

তারপর ডানপাশের গুটিগুলোকে বিন্যস্ত করেন পূর্বের মতো: দাগে থাকা পাঁচটি গুটির পরিবর্তে একটি গুটি উঠিয়ে দেন উপরে ফাঁকা জায়গায়, ফাঁকা জায়গায় থাকা দুটি গুটির পরিবর্তে একটি উঠিয়ে দেন উপরের দাগে।

নিচের গুটি তিনটির কাজ শেষ। বার্তোলোমিউ এবার উপরের দুটি গুটি দ্বারা একশত সাতাশের গুটিকে গুণ করেন, অর্থাৎ এবার তিনি একশ সাতাশকে বিশ দিয়ে গুণ করছেন। গুটি দুটি যেহেতু সর্বনিম্ন স্তর থেকে এক দাগ উপরে অবস্থান করছে, তিনিও তাই এবার গুণফলের গুটিগুলোকে যার যার পূর্বের অবস্থান হতে এক দাগ তুল্য স্থান উপরে উঠিয়ে দেন। বার্তোলিমিউর ছবিটি এবার দেখায়:

ঝড়ের গতিতে হাত চলে বার্তোলোমিউর, উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠে দর্শক। গুটিগুলো সুবিন্যস্ত করতে শুরু করেন তিনি, আর তখনই হারমানের গলা স্তব্ধ করে দেয় সবাইকে: দুই হাজার নয়শত… ।

তীব্র উদ্বিগ্নতায় এক মুহূর্ত থেমে থাকে বার্তোলোমিউর হাত, পরক্ষণেই কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি—বহু অভিজ্ঞতা জীবনে তার, আশা আছে এখনও, হারমানের ভুলও হতে পারে।

না, ভুল হয়নি হারমানের, দুই হাজার নয়শত একুশটি রৌপ্যদণ্ডই দরকার!

স্তব্দ হয়ে যায় ফিরানযার মানবসমুদ্র!

ভয়ঙ্কর সারাসিন জাদু
লাঠির উপর ভর করে দাঁড়ান ফাদার ম্যানোলা, তাকান হারমানের দিকে।
“আপনি বলেছেন, সারাসিনদের সংখ্যায় সিফর নামে গোলাকার একটি প্রতীক আছে?” প্রশ্ন করেন তিনি।
“জ্বি, সংখ্যায় কোনো মান না হলে এটি সেখানে বসানো হয়, এর মান শূন্য।”
“তার মানে এ কিছুই না, নিছক প্রতীক মাত্র, যার নেই কোনো মান, নেই কোনো অর্থ?”
“ঠিক তা নয়, ফাদার,” ম্যানোলার প্রসঙ্গ বুঝতে না পেরে অস্বস্তি বোধ করেন হারমান। “সংখ্যাতত্ত্বে এর গুরুত্ব অপরিসীম, এর রয়েছে মান, রয়েছে গভীর অর্থ। কোনো সংখ্যার ডানে এটি একবার করে বসলে সংখ্যাটির মান দশগুণ করে বেড়ে যায়। তাই নয়, এটি শুধু খালি স্থানের প্রতীকই নয়, অন্যান্য সংখ্যার মতোই স্বতন্ত্র সংখ্যাও বটে, যাকে করা যায় যোজন বিয়োজন কিংবা গুণন।”
“তার মানে আপনি বলছেন, সিফর কিছুই না, তা নয়, বরং সিফর কোনোকিছু?”
“জ্বি।”
“না, ex nihilo nihil fit, যা কিছুই না, তা থেকে যা আসে তা-ও কিছুই না! আপনার সিফর আসলে ভয়ঙ্কর এক সারাসিন জাদু।” জোরালো গলায় উচ্চারণ করেন ম্যানোলা।

সারাসিন জাদু, সারাসিন জাদু… মৃদু গুঞ্জন শোনা যায় মানুষের মধ্যে।
“আজ থেকে ফিরানযার মাটিতে সারাসিন জাদুবিদ্যার গণিত নিষিদ্ধ,” ঘোষণা করেন জিওভান্নি। “আশা করি, অদ্যই ফিরানযা ত্যাগ করে হারমান ভন স্যাক্সন তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবেন।”

শীত শেষ হয়েছে ইউরোপে। হেমন্তের আগমনে কচি পাতা গজাচ্ছে বৃক্ষে বৃক্ষে, সবুজ হয়ে উঠছে মাঠ-প্রান্তর, ডাকছে গানের পাখিরা। পিঠে ঝোলা চাপিয়ে প্রজাপতির ফিনফিনে ডানার মতো রোদের ভেতর হেঁটে চলছেন হারমান। পবিত্র ভূমিতেও মন টেকেনি তার, স্যাক্সনির বুকেই হোক চিরঘুম, এ আশায় জেরুজালেম ছেড়েছেন তিনি।

ইউরোপ নিশ্চয়ই গভীর মায়া আর আগ্রহে একদিন গ্রহণ করবে প্রাচ্যদেশীয় গণিত। গণিতের ভালোবাসায় বিষাদ-কোমল হয় হারমানের হৃদয়, গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা চোখের জল। বিস্তৃর্ণ শ্যামল প্রান্তরে প্রজাপতির ফিনফিনের ডানার মতো রোদে মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করে হারমানের অশ্রু।

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর…

About ম্যাভেরিক

Leave a Reply

Scroll To Top