Home / গণিতের ইতিহাস / ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প (পর্ব 2)

ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প (পর্ব 2)

আগের পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন

“কেমন আছ তোমরা, হে অভিমন্ত্রিত [initiated] সত্যব্রতগণ?” দু’হাত প্রসারিত করে হাস্যপ্রোজ্জ্বল মুখে জানতে চান পীথাগোরাস।
“চমৎকার, হে মহান গুরুদেব!” সমস্বরে বলে উঠে সবাই।
“তোমরা হচ্ছ নির্বাচিতগণ,” শান্তস্বরে বলেন পীথাগোরাস,”তোমরা পরিহার করবে সব ধরণের উগ্রবাদিতা। সর্বোতপ্রচেষ্টায় তোমাদেরকে অপসারণ করতে হবে, এবং ছিন্ন করতে হবে অগ্নি ও তরবারির মাধ্যমে, এবং আরো নানাবিধ উপায়ে, দেহ থেকে অসুস্থতা, আত্মা থেকে অজ্ঞানতা, উদর থেকে ভোগবিলাস, নগরী থেকে অরাজকতা, পরিবার থেকে বিভেদ, এবং সকল ক্ষেত্রে বাহুল্য।”
“জী, গুরুদেব।” সবার হৃদয়ে গেঁথে থাকে বাণীটি।

পীথাগোরাসের নেতৃত্বে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ অতঃপর মেতে উঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনায়, নিয়ন্ত্রিত বিতর্কে, প্রশ্নোত্তরে। কেটে যায় বেশ কয়েক ঘন্টা, শেষ হয় প্রথম পর্বের আলোচনা।

অপরাহ্নে, অড্রিয়াটিক সাগর থেকে উঠে আসা বর্ষবায়ু (etesian wind) যখন বয়ে যাচ্ছিল আয়োনিয়ার উপর, দলটি আবার সমবেত হয়, এবার আলোচনার বিষয়বস্তু অতিন্দ্রীয় শাস্ত্র (esoterica)।
“আপনার জীবনের কথা বলে আমাদের সম্মানিত করুন, হে গুরুদেব।” লুকানিয়া থেকে আগত কমনীয় চেহারার মেয়েটি, ঈসারা (Aesara) তার নাম, উঠে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে; তীব্র কৌতূহলে নড়েচড়ে বসে সবাই।

স্মিতহাস্যে আলখেল্লাটি ঠিক করে নেন পীথাগোরাস। মনে তাঁর ভীড় করে কত না স্মৃতি—নদী, দরিয়া আর পথের অন্তহীন বয়ে চলা, নগর ও বন্দরসমূহের শান-শওকত, উত্থান-পতন, নানা জাতির মানুষ, দেহ ও মনে তাদের হরেক রঙের খেলা; সম্মোহিত হয়ে যান দার্শনিক কয়েক মুহূর্তের জন্য।

“সাতচল্লিশতম অলিম্পিয়াডের প্রাক্কালে জন্ম আমার। আমার বাবা নেসারকাস (Mnesarchus) ছিলেন ফিনিশিয়ার [Lebanon] বন্দরনগরী টায়ারের (Tyre) মুক্তা ব্যবসায়ী, মা ঈজিয়ানতীরে সামোস নগরীর (Samos) মেয়ে পার্থেনাস। সামোসের ভয়ানক দুর্ভিক্ষে বাবা একদা প্রচুর খাদ্শস্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, ফলে নগরীর অধিকর্তাগণ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সামোসের নাগরিকত্ব দান করেন।

আমি যখন মাতৃগর্ভে, মা’কে নিয়ে বাবা পার্নেসাস পর্বতের পাদদেশে ডেলফাই’র(Delphi) দৈববাণীর মন্দিরে গমন করেন, এপোলোর সন্ন্যাসিনী পীথিয়ার (Pythia, Pythoness) ওরাকল শুনতে। পীথিয়া আমার পিতাকে তাঁর জাহাজের জন্য অনুকূল বাণিজ্যবায়ুর ভবিষ্যতবাণী ব্যক্ত করে, এবং সুসংবাদ প্রদান করে আমার আগমনের, যা বাবা তখনও জানতেন না। ডেলফাই থেকে টায়ারে ফেরার পথে সিডন (Sidon) বন্দরে আমার জন্ম হয়। বাবা-মা খুশিতে সন্ন্যাসিনীর নামানুসারে আমার নাম রাখেন পীথাগোরাস—পীথিয়া’র মতো কথা বলে যে।

জগতকে জানার অদম্য স্পৃহা আমার উপর ভর করে সেই শৈশবেই, বাবার বাণিজ্য অভিযাত্রায় প্রায়ই তাঁর সহযাত্রী হতাম আমি। এভাবে ঈজিয়ান, এশিয়া মাইনর এবং ফিনিশিয়ার তীরে হাঁটতে হাঁটতে বড় হতে থাকি আমি।

আমার বিদ্যাশিক্ষার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ করেন বাবা। ছেলেবেলায়ই শামদেশের (Syria) বিদ্বজ্জনদের কাছে দীক্ষা লাভ করি আমি, সংস্পর্শে আসি আমার প্রিয় শিক্ষক ফেরেকাইদেসের (Pherekydes)।

অষ্টদশ বর্ষ বয়স পূর্ণ হলে আমি গমন করি মাইলিটাস নগরে, গ্রিক জ্ঞানের পুরোধা বৃদ্ধ থেলিজ (Thales) ও তাঁর ছাত্র অ্যানাক্সিম্যান্ডরের (Anaximander) সাহচর্য লাভ করি। পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য থেলিজ আমাকে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশে (Khemet-Deshret) গমন করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

দূরদেশ গমনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সিডন বন্দরে ফিরে আসি আমি, এখানে আরো কিছুকাল বিবলস ও টায়ারের যাবতীয় অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে অভিমন্ত্রিত হই। তারপর শুভ এক দিনে কারমেলাস পর্বতের পাদদেশে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশ মিশরগামী এক জাহাজে আরোহণ করি আমি।

মিশরের ফারাও আমাসিস (Ahmose II) এবং তাঁর গ্রিক স্ত্রী রদোপেস [Rodhopes, ইনি প্রাচীনতম সিন্ডারেলা, যার উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর নানা দেশে সিন্ডারেলা কাহিনী ছড়িয়েছে এবং ঈশপ যাকে রূপকথা শোনাতেন] আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ফারাওয়ের প্রাসাদে কিছুদিন কাটানোর পর তাঁর রাজ্যের উচ্চ পুরোহিতদের কাছে দীক্ষা নেবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি আমি, রাজা তখন আমাকে একটি সুপারিশনামা লিখে পাঠিয়ে দেন মেমফিসের মন্দিরে ও পিরামিডে।

কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ মিশরীয়রা চূড়ান্ত রকমের গোপনীয়তা অবলম্বন করত তাদের জ্ঞান-সাধনায়, যেরকম করে গিয়েছিল ত্রিভূবনের জ্ঞানী থোথ-হার্মিস-ট্রাইম্যাজিস্টাস। তিন দিবস তিন রজনী আমি অতিবাহিত করি পাথরের শবাধারে (sarcophagus), মিশমিশে অন্ধকার এক গুপ্ত প্রকোষ্ঠে, আলোর প্রতীক্ষায়। আস্তে আস্তে আলোড়িত হতে থাকে শরীর আমার, বাড়তে থাকে হৃদস্পন্দন, ধীরে ধীরে চেতনা হারাই আমি। আমি অনুভব করি আলো, ভাসতে থাকে সত্তা আমার, অনন্তকালের গর্ভে, ফিনিক্স পাখির মতো উড়তে থাকে আমার আত্মা। চারপাশে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করি আমি, অবলোকন করি আকার ও সংখ্যা।

“তুমি এখানে, পুনরুজ্জীবিত, অনুভব করেছ মহান রহস্য। মৃত্যুকে পরাভূত করেছ তুমি, অর্জন করেছ মৃত্যুঞ্জয়তা।” তিন দিন পরে উচ্চ পুরোহিত সঞ্চিসের গলার স্বরে জাগরণ আসে আমার। “এসো, অভিমন্ত্রিতদের গৌরব উদযাপন কর। তুমি হয়েছ আমাদেরই একজন, লাভ করেছ নবজন্ম।”

২২ বছর মিশরে কাটাই আমি, আয়ত্ত করি তাদের জ্যামিতিক জ্ঞান, সান্নিধ্যে আসি দড়ি-প্রসারণকারীদের (rope stretcher)। প্রতিবছর নীল নদের বন্যায় ভেসে যেত জমির খাড়া আল, ফারাও তখন নীলের অববাহিকায় পাঠাতেন দড়ি-প্রসারণকারীদের, কতটুকু জমি কমে গেল তা পরিমাপ করতে। পরিমাপের কাজে সূক্ষ্মভাবে সমকোণ বানানোর প্রয়োজন হতো তাদের, এর জন্য সমান দূরত্বে তৈরি করা ১২টি গিঁটের দড়ি নিত তারা। তারপর মাঝ থেকে এমনভাবে ৩ গিঁট নিত, যাতে একপাশে ৪গিঁট ও অন্যপাশে ৫ গিঁট থাকে এবং তাদের প্রান্ত জোড়া দিয়ে একটি ত্রিভুজ সৃষ্টি করা যায়, যা সবসময় সমকোণ সৃষ্টি করে। অন্য কোনো ভাবে গিঁট নিলে কখনো সমকোণ হতো না।

মহান থেলিজও আমাকে এই ত্রিভুজের কথা বলেছিলেন, গভীরভাবে তা নিয়ে ভাবতে থাকি দিনের পর দিন। বহু বছর পর আমার সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র আবিষ্কারে দড়িপ্রসারণকারীদের ত্রিভুজের অবদানের কথা আমি অস্বীকার করতে পারি না।

বাইশ বছর পর সামোসে ফেরার প্রস্তুতি নেই আমি। ফারাও আমাসিস মারা গেছেন ততদিনে, উচ্চ ও নিম্ন মিশরের অধিপতি এখন তাঁর ছেলে তৃতীয় সামতিক (Psamtik III)। আর এ সময়ই মিশরে বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা, ফিনিশিয়ার তীর ঘেঁষে সিরোক্কো হাওয়ার মতো প্রবল প্রতাপে মরুভূমি ধরে মিশরের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে আসুর-রাজ (Assyrian/Persian) ক্যাম্বাইসিজ (Cambyses II)।

আগামী পর্বে সমাপ্য

About ম্যাভেরিক

Scroll To Top