Home / গণিতের ইতিহাস / প্রাচীন মিশরে ফারিনের গাণিতিক অভিযান (১)

প্রাচীন মিশরে ফারিনের গাণিতিক অভিযান (১)

অফিসের কাজে বাইরে ছিলাম এক সপ্তাহ। বাসায় ফিরতেই দৌঁড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারিন, “এগুলো কী বলো তো, বাবা?” কাগজে আঁকা দুটি ছবি আমার সামনে তুলে ধরে।

গভীর মনোযোগ দিয়ে আমি তাকাই ছবিগুলোর দিকে, পাখি সাপ বাক্স…। বিচ্ছিন্ন ছবি, আদৌ কোনো মানে আছে?
“পারছি না মামনি, হায়ারোগ্লিফের (hieroglyph) মতো লাগছে একেবারে।” ছবিগুলোর দুর্বোধ্যতা ভ্রমণের ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয় আমার, হাল ছেড়ে দেই আমি, কিন্তু মেয়ের জন্য চেহারায় তীব্র কৌতূহলটি ধরে রাখি।
“হায়ারোগ্লিফই তো! কিন্তু কী লেখা আছে এতে, বলো।” মিটিমিটি হাসে মেয়ে।

প্রাচীন মিশরীয় চিত্রলিপি হায়ারোগ্লিফের কথা মনে পড়ে আমার। hiero- মানে পবিত্র, আর -glyph হচ্ছে লিপি, কিন্তু হায়ারোগ্লিফ শব্দটি আমি ব্যবহার করেছি এর দুর্বোধ্যতায়, আজকাল যে অর্থে শব্দটি দৈনন্দিন কথাবার্তায় বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, পবিত্রলিপি অর্থে নয়। ঠিক যেরূপ hierarchy শব্দটি এককালে ধর্মগুরুদের রাষ্ট্রশাসনব্যবস্থা (-archy, রাষ্ট্রশাসন) বুঝিয়ে থাকলেও বর্তমানে এর মানে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা ধাপ। মেয়ের আনন্দ ও চ্যালেঞ্জ আর আমার কাকতালীয়তায় হাসি আমি।

“এ হচ্ছে হায়ারোগ্লিফে তোমার আর আম্মুর নাম।” ঠোঁট টিপে গাল প্রসারিত করে ফারিন বলে।
“আরেব্বাস, তাই নাকি!” মেয়ের প্রশংসায় আশ্চর্যান্বিত হই আমি, প্রশ্ন করি, “কিন্তু তুমি কখন কীভাবে শিখলে? বই পড়ে?”
“শান্তির আত্মা’র কাছ থেকে শিখেছি আমি।” রহস্যময়ভাবে বলে সে।
ভালো করে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম প্রাচীন এক মিশরীয়’র সাথে দেখা হয়েছিল তার, সে-ই শিখিয়েছে এসব।

ফারিনের গল্প
“কে তুমি, মেয়ে? কোত্থেকে এসেছ?” প্রশ্ন করে বৃদ্ধ, শান্ত, মায়াভরা দৃষ্টি তাঁর।
“আমার নাম ফারিন, যার মানে আলোকিত এবং অভিযানপ্রিয়,” উত্তর দেয় ফারিন। “বঙ্গ-সাগরের তীরে, অনেক নদীর দেশ থেকে এসেছি আমি, অনেক সুন্দর সে দেশ। তোমার নাম কী?”
“আমি খু-এন-হোতেপ, মানে শান্তির আত্মা। আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে আই-এম-হোতেপ নামে বহু শাস্ত্রে পণ্ডিত, মহাজ্ঞানী এক মানুষ ছিলেন আমাদের দেশে। খুব সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও বুদ্ধি আর প্রচেষ্টার দ্বারা তৃতীয় রাজবংশের রাজা ফারাও জোসের-এর প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হন তিনি, পরে রাজা থেকেও বিখ্যাত হয়ে যান। তাঁকে আমরা বলি, ‘শান্তির সময়ে আগমন যাঁর।’ তাঁর নামের সাথে মিলিয়েই বাবা মা আমার নাম রাখেন খু-এন-হোতেপ।”

“এমনিতে তুমি কী কর? আর এত নির্জন কেন এখানে?” প্রশ্ন করে ফারিন।
বিষাদের ছায়া পড়ে বৃদ্ধের সৌম্য চেহারায়। “আমি একজন লেখক-শিক্ষক, আমাদের ভাষায় শিক্ষা দিতাম ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে। বাবা-মা মারা গেছেন বহুদিন আগে, আত্মীয়স্বজনও তেমন নেই আমার। শিশুদের নিয়েই ছিল জীবন, কিন্তু তারাও আজ আসে না আর।” বলতে থাকে বৃদ্ধ, “গ্রিক-রোমান ভাষার প্রভাবে হারিয়েই গেছে আমাদের মাতৃভাষা, সেসব ভাষাই এখন শিখছে মানুষ, তাতেই চলে চাকরি আর ব্যবসা। আমার পাঠশালাটি ভেঙে গেছে, চারপাশে বেড়ে উঠছে লতানো পাতার জঙ্গল।” দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে খু-এন-হোতেপ।

শুধু পাঠশালা নয়, খু-এন নিজেও ভেঙে পড়ছে দেখে দুঃখিত হয় ফারিন, সান্ত্বনা দেয় সে, “মাতৃভাষা হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু হতাশ হয়ো না, তোমাদের ভাষা একেবারে শেষ হয়ে যাবে না। আমি শিখব তোমাদের ভাষা ও গণিত, তুমি কী শিখাবে আমায়?”
“সত্যি শিখবে!” উজ্জ্বল হয়ে উঠে বৃদ্ধের মুখ, “শোনো তাহলে, বলছি—কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশের এ মহান গল্প এক!”

“আমাদের দেশের প্রাচীন নাম খেমেত, মানে কৃষ্ণভূমি; নীলের উর্বর পলিমাটির রঙের কারণে এ নাম। আবার নীলের দু’পাশে এবং পূর্ব সাগরের তীরে যে মরুভূমি, তার কারণে দেশকে আমরা দেশরেত, অর্থাৎ লোহিতভূমিও বলি। আনুমানিক চল্লিশ হাজার বছর আগে মানব বসতি শুরু হয় এখানে। তারপর মানুষ যখন বাড়ল, দূর-দূরান্তে খবর পাঠানোর প্রয়োজন হলো, তখন থোথ নামে এক জ্ঞানীমানব স্রষ্টার কাছ থেকে আমাদের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসে এক লিখন পদ্ধতি; একে আমরা বলি মেদু নেতজার বা স্রষ্টার বাণী। গ্রিকরা আমাদের এ ভাষাকে বলে হায়ারোগ্লিফ, তাদের ভাষায় হায়ারো- মানে পবিত্র, -গ্লিফ মানে লিপি বা খোদাইকৃত লেখা।”
“কেমন ছিল সেই লিখন পদ্ধতি?” ফারিন জানতে চায়।
“বিভিন্ন জিনিসের ছবি এঁকে এঁকে শব্দ বা সংখ্যা লিখতাম আমরা। ছবিগুলোকে আমরা দু’ভাবে ব্যবহার করতাম: একটি ছবি পুরো একটি শব্দকে বুঝাতে পারে, আবার কোনো একটি ধ্বনিও বুঝাতে পারে। যেমন, সাপ বুঝাতে তুমি সাপের এ চিহ্নটি এককভাবে ব্যবহার করতে পার,

আবার স আ প-এ তিনটি ধ্বনির জন্য সংশ্লিষ্ট এ তিনটি ছবিও সমন্বয় করে ব্যবহার করতে পার:

“কিন্তু হায়ারোগ্লিফের এসব সূক্ষ্মচিত্র আঁকা বেশ পরিশ্রমসাধ্য ও সময়ের ব্যাপার, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে এতে দেখা দেয় নানা সমস্যা। কাজেই হায়ারোগ্লিফ লিপির প্রায় সমসাময়িক কালেই দৈনন্দিন কাজে, জিনিসপত্রের হিসেব কিংবা চিঠিপত্র লিখায়, আরেকটি সরলীকৃত লিপি উদ্ভাবন করেন জ্ঞানীমানবগণ। সবুজ কালি আর নলখাগড়ার লাল কলম দিয়ে টানা হাতে তাঁরা লিখে যেতেন এসব প্রতীক, যার নাম যাজকীয় লিপি, গ্রিকদের ভাষায় হায়েরাটিক।”

“হুমম, এটি আসলেই হায়ারোগ্লিফের চেয়ে সোজা।” লিপি দুটির পারস্পরিক ছবি দেখে মতামত ব্যক্ত করে ফারিন।
“হায়েরাটিকের পর ডেমোটিক নামে আরেকটি লিপি চালু হয়েছিল আমাদের দেশে, এই তো কয়েক বছর আগেও ছিল এর প্রচলন। কিন্তু আজ কেবল চলছে গ্রিক বর্ণমালায় লিখা কপটিক লিপি। আহ্‌!” খু-এন-হোতেপের আক্ষেপটি ভাসতে থাকে ঘরের মধ্যে।

খানিক চুপ থাকে খু-এন, তারপর বলে, “সংক্ষেপে, এ-ই হচ্ছে আমাদের ভাষার কাহিনী। এবার বলছি গণিতের কথা।
আমাদের সংখ্যা দশ-ভিত্তিক, এর মানে এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা লিখলে আমরা কাঠির মতো দেখতে একটি প্রতীক ব্যবহার করি। এক লিখতে প্রতীকটি এক বার, দুই লিখতে দুই বার, এমনিভাবে নয় লিখতে নয় বার ব্যবহার করি।
দশ লিখতে গেলে আবার আগের প্রতীকটি দশ বার ব্যবহার না করে, নতুন একটি প্রতীক গ্রহণ করি।”

“তার মানে নতুন প্রতীকটির একটির মানই দশ। এভাবে তোমরা বিশ, ত্রিশ, …,নব্বই পর্যন্ত লিখ। তারপর একশ, দুশ, তিনশ, …এদের জন্য আবার নতুন প্রতীক।” ফারিন বলে।

উজ্জ্বল হয় বৃদ্ধের মুখ, “ঠিক বলেছ তুমি। এভাবে সাতটি ভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করি আমরা। আমাদের চিত্রাকৃতির সংখ্যা প্রতীকগুলি তোমাকে দেখাচ্ছি।” খু-এন-হোতেপ দ্রুত প্রতীকগুলি এঁকে ফেলে প্যাপিরাসে:

খানিক পর প্যাপিরাসের টুকরোটি উল্টে ফেলে খু-এন-হোতেপ। হাসতে হাসতে বলে, “দেখি, কেমন তোমার স্মৃতিশক্তি; গণিতে তোমার বুদ্ধিই বা কেমন!” প্যাপিরাসের আরেকটি টুকরো তুলে নেয় বৃদ্ধ, নিচের প্রতীকগুলো আঁকে, তারপর প্রশ্ন করে, “এ সংখ্যাটির মান কত?”

চারটে জলপদ্ম, দুটি দড়িকুণ্ডলি, পায়ের গোড়ালির পাঁচটি হাড়, আর সাতটি কাঠি। ডান থেকে বামে তাকালে আমাদের সংখ্যার মতোই দেখতে, কেবল চিহ্নগুলো অন্যরকম। আরেকটি পার্থক্য আছে: আমাদের সংখ্যায় একক, দশক, শতক, …, একটি ঘরের জায়গায় একটি মাত্র প্রতীক লিখি, এরকম একাধিক প্রতীক নয়।

একটি পদ্ম চারার মান এক হাজার, তা সংখ্যার যেখানেই লেখা হোক না কেন, আগের প্যাপিরাসটির কথা মনে করে ফারিন। কাজেই এর মান হওয়া উচিত চারটে হাজার, দুটি শত, পাঁচটি দশ, সাতটি এক। “চার হাজার দুশ সাতান্ন!” উত্তর দেয় ফারিন।

“দেশরেতের উপর উড়ে যাওয়া শিকারি বাজপাখির মতোই ক্ষীপ্র তোমার হিসেব।” প্রশংসায় উদ্ভাসিত হয় খু-এন এর মুখ। ফারিন বুঝল, প্রাচীন মিশরীয় সংখ্যা আমাদের সংখ্যার মতো দশ-ভিত্তিক হলেও স্থানীয়মানভিত্তিক নয়। তার মানে মিশরীয় সংখ্যাপদ্ধতিতে কোনো সংখ্যাকে গ্রুপ করে করে প্রতীক আকারে লেখা হয়, সংখ্যাটি বের করতে হলে আলাদা করে প্রতীকগুলির মান জেনে যোগ করতে হবে। একটু জটিল হলেও বেশ মজার, বিশেষ করে হাজার হাজার বছর আগের কথা, আর ছবিগুলিও বেশ সুন্দর। ফারিন মুগ্ধ হয় প্রাচীন মিশরীয়দের গাণিতিক উৎকর্ষে।

বৃদ্ধ হাঁপিয়ে উঠে, তাঁর কপালে ঘামের ছাপ।
“তুমি একটু বসো, আমি আসছি।” দৌড়ে গিয়ে একপাত্র পানি নিয়ে আসে ফারিন। ঢক ঢক করে পান করে খু-এন-হোতেপ, “আহ, ধন্যবাদ তোমাকে, ফারিন।”

ঘরের কোণে শক্ত এক তালাবদ্ধ কাঠের সিন্ধুক। খু-এন-হোতেপ তালা খুলে তার ভেতর থেকে ৬ মিটার লম্বা ১/৩ মিটার প্রশস্ত প্যাপিরাসের একটি স্ক্রল বের করে পড়তে থাকে:
“জানিয়া রাখ তোমরা, লিখিত হইয়াছে এই গ্রন্থখানি তেত্রিশতম বর্ষে, প্লাবনের চতুর্থ মাসে, উচ্চ ও নিম্ন খেমেতের মহামহিম সম্রাট আ-সুর-রে’র বদান্যতায়, জীবনের উপহারে, সেই গ্রন্থের অনুরূপ করিয়া যাহা রচিত হইয়াছিল প্রাচীনকালে, উচ্চ ও নিম্ন খেমেতের সম্রাট নে-মা-এত-রে’র জীবনকালে. লিপিবদ্ধ হইয়াছে ইহা সুবর্ণিক আহমেসের হস্তে…”

___________________
ক্রমশ

About ম্যাভেরিক

11 comments

  1. আপনার লেখার আলাদা এটা ধরন আছে, ভালো লাগলো।
    ভালো থাকবেন।

  2. আপনার এ পোস্ট টি পড়ে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অনেকটাই জানতে পারলাম। শান্তির আত্মা এবং ফারিন এর কথপকথন অনেক সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে, প্রাসঙ্গিক চিত্র গুলি লেখার মান কে অনেকটাই বারিয়ে দিয়েছে । আই-এম-হোতেপ এর জীবন কাহিনী আমাকে আমাকে অনুপ্রানিত করেছে তার মত হাওয়ার । :idea:

Leave a Reply

Scroll To Top