Home / গণিতের ইতিহাস / পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (সম্পূর্ণ)

পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (সম্পূর্ণ)

[১]
শুনশান নীরব দুপুর, ১৫ ই জানুয়ারি ২০১০
মেঘনা-তিতাসের বাঁক, কাশবনের ধার, গ্রামের জংলা ঝোঁপ

প্রিইইই…
তীক্ষ্ণ চিৎকারে হঠাৎ ভেঙে পড়ে নীরবতা। ক্ষীণতর হয়ে গেল নদীর কুলকুল ধ্বনি, ঝরা পাতার মচমচ শব্দ, কাশবনের সরসর দোল। চমকে উঠে ফারিন, দ্রুত চোখ বোলায় চারপাশে। কিন্তু না, চোখে পড়ছে না কিছুই!

প্রিইইই…, এবার আরো জোরালো হলো শব্দ, আরো কাছ থেকে আসছে মনে হলো।
“এগুবে না, এগুবে না আর! দেখতে পাওনা, একেবারে গায়ের উপর এসে পড়লে যে!”

পায়ের দিকে এবার তাকায় ফারিন। দৃশ্য দেখে হাসি চেপে রাখতে পারে না কোনো মতেই: শুঁড় আর সামনের দু’টি পা উঁচু করে যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে মুষ্ঠিযোদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে একটি পিঁপড়া।

“ভয় পেয়ো না, আমি তোমাকে মারব না। সত্যি বলতে কী, পিঁপড়াদের খুবই ভালোবাসি আমি।” আশ্বাস দেয় ফারিন।
“আমার নাম পিঁপশঙ্ক—পিঁপ অশঙ্ক, মানে অদম্য সেই পিঁপড়া শঙ্কা জানে না যে। ভয় আমি পাইনি মোটেও, কিন্তু তোমরা যদি কাউকে ভালোই বাস, তাহলে তার সাথে কীভাবে উদ্ধত অবজ্ঞার আচরণ করো?”
“এর মানে কী, পিঁপশঙ্ক? অবাক হয় ফারিন।
“এই যে বললে পিঁপড়াদের ভালোবাস তুমি। তাহলে জমিনের উপর দিয়ে এভাবে সংবেদনহীন, অসতর্কভাবে কীভাবে হেঁটে যেত পার? আমি তোমাকে না দেখলে এবং চিৎকার না করলে তো পিষেই ফেলছিলে!” ক্ষোভে-মেশানো কণ্ঠ পিঁপের।
“আসলেই আমার ভুল হয়েছে, আর এরকম হবে না কখনো।” অনুতপ্ত গলায় জবাব দেয় ফারিন।
“আমার নাম ফারিন, আলোকিত ও অভিযানপ্রিয়। আমি তোমার বন্ধু, পিঁপ।” বলতে বলতে পিঁপশঙ্ককে হাতে তুলে নেয় সে।
হাসি ফুটে উঠে পিঁপের ঠোঁটের কোণ, শুঁড় বাড়িয়ে স্পর্শ করে ফারিনের হাতের তালু। “ধন্যবাদ তোমাকে।”

“তুমি কী করছিলে?” ফারিনের প্রশ্ন।
“আমি একজন অনুসন্ধানী (scout) পিঁপড়া, বেরিয়েছি আমার গোত্রের জন্য নতুন রাজ্য খুঁজতে।”
“নতুন রাজ্য কেন? আগের রাজ্য কি ধ্বংস হয়ে গেছে?”
“না, ধ্বংস হয়নি। ঐ যে, পাকুড় গাছটা দেখছ, তার পাশে আমাদের বর্তমান রাজ্য। কিন্তু আমাদের জন্যসংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে তো, শিশুদের ভালোভাবে বেড়ে উঠার জন্য নতুন, প্রশস্ত এলাকা দরকার।”
“ওখানেই নতুন বাসা বানিয়ে নাও না কেন তোমরা?”
“আমরা তোমাদের মতো অবিমৃষ্যকারী নই যে সবাই রাজধানীর দিকে ছুটব আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকব।” মানুষের বোকামির কথা ভেবে উষ্ণ হয় পিঁপের কণ্ঠ। “জনসংখ্যার সাথে আমাদের বাসস্থানের আকারের সুনির্দিষ্ট একটি আনুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। জীবনের সুষ্ঠু বিকাশে অনুপাতটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই কষ্ট হলেও প্রয়োজনে খোলামেলা রাজ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি আমরা। আমার মতো আরো অনেক স্কাউট বেরিয়েছে চারদিকে, তবে আশা করছি সবার আগে আমিই ভালো একটা জায়গার সন্ধান পেয়ে যাব।” হাসিতে উদ্ভাসিত হয় পিঁপের মুখ।

“কীভাবে রাজ্য খুঁজ তোমরা আমি দেখব।” অনুরোধ করে ফারিন।
“আচ্ছা, হাত থেকে নামিয়ে দাও আমাকে। তারপর আমার পেছন পেছন আস।”
হাতের তালু থেকে পিঁপশঙ্ককে নামিয়ে দিল ফারিন। এগিয়ে যেতে থাকে অদম্য সেই পিঁপড়া শঙ্কা জানে না যে।

বেশ অনেক ক্ষণ হাঁটার পর বিশাল এক অশ্বত্থ গাছের পাশে শক্ত লালমাটির একটি ঢিবি দেখতে পায় পিঁপ। তার ধার বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে সে, তারপর হঠাৎই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
“পিঁপ, পিঁপ, পিঁপশঙ্ক! কোথায় গেলে তুমি?” চিৎকার করে ডাকে ফারিন।
প্রায় দু’মিনিট পর পিঁপের শুড় দেখা যায়, দুর্বাঘাসের আড়ালে একটি গর্তের মুখে।
“সম্ভাব্য রাজ্য দেখে এলাম একটা, ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করলাম তার চারপাশটা।” হাসে পিঁপ।
“তুমি তো দেখলাম গর্তের ভেতর ঢুকলে। অন্ধকারে আবার কী পরীক্ষা করলে, কীভাবেই বা করলে!” বেশ অবাক হয় ফারিন।
“হ্যাঁ, ভেতরটা একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আলকাতরার মতো কালো। তবে আমরা তো আর চোখে দেখে কোনো জায়গার ক্ষেত্রফল হিসেব করি না, স্পর্শ করে করে ক্ষেত্রফল বের করি।” রহস্যময় ভঙ্গিতে শব্দ করে হাসে পিঁপ, চোয়াল প্রশস্ত হয় তার।

ফারিনের কাছে আসে পিঁপশঙ্ক। তারপর ঘুরে আবার রওয়ানা দেয় গর্তের দিকে।
“আরে, আরে, কোথায় যাচ্ছ আবার?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ফারিন।
“আমার কাজ শেষ হয়নি তো এখনও, গর্তে ঢুকতে হবে আরেকবার। তারপরই ক্ষেত্রফলের হিসেব শেষ হবে।”
“ঘাসের ভেতর তো অনেক গর্ত, আগের গর্ত চিনতে পারবে?”
“গর্তের দেয়াল ঘেঁষে আমার শরীর থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থের একটা পথ বানিয়ে এসেছি, যাকে বলে ফেরোমোন ট্রেইল (pheromone trail)। আমাদের প্রত্যেক স্কাউটেরই রয়েছে যার যার নিজস্ব ফেরোমোন ট্রেইল বানানোর ক্ষমতা, একটির সাথে অন্যটির ঝামেলা হয় না কখনো। গন্ধ শুঁকে আমার সঠিক গর্তটি ঠিকই বের করে ফেলব।” পিঁপের কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়।

ঘাসের ভেতর হারিয়ে যায় পিঁপ। এবার বেশ অনেকটা সময় পর বেরিয়ে আসলো সে, মুখের হাসিটি আরো বিস্তৃত হয়েছে তার।
“পছন্দ হয়েছে জায়গাটা, হিসেব করলাম ক্ষেত্রফল। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আর চারপাশের বিন্যাস সব মিলিয়েও চমৎকার। যাই, সবাইকে নতুন রাজ্যের খবর দিয়ে আসি।”
“কিন্তু তোমার মতো আরো অনেকেই হয়তো এরকম নতুন রাজ্যের সন্ধান নিয়ে যাবে, তাই না? কারটা চূড়ান্ত হবে?”
“হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, ফারিন। আর আমরা পিঁপড়ারা গণতান্ত্রিকও বটে। আমি এখন বেশ কয়েকজনকে রিক্রুট করব জায়গাটা দেখার জন্য, তারাও সেটি পরীক্ষা করে দেখবে। যার রাজ্য সবচেয়ে বেশি পিঁপড়ার পছন্দ হবে, সেটিই নির্বাচিত হবে নতুন নিবাস হিসেবে।”
“কিন্তু ঠিকমতো বাসায় পৌঁছতে পারবে তো তুমি?” ফারিন প্রশ্ন।
“হ্যাঁ,” মাথা ঝাঁকায় পিঁপ, “বাসা থেকে এ পর্যন্ত আমি ৩৩,০০০ কদম এসেছি। গুণে গুণে ঠিকই বাড়ি ফিরে যেতে পারব।”

তারপর একটু বিষণ্ণ যেন হয় পিঁপের স্বর। “আচ্ছা, যাই তাহলে, পরে কথা হবে। খুব ভালো লাগল তোমাকে দেখে। ও হ্যাঁ, বাড়ি যাবার সময় একটু সাবধানে, নিচের দিকে তাকিয়ে যাবে কিন্তু।” অনুরোধ করে সে।
মৃদু হাসল ফারিন, “হ্যাঁ, অবশ্যই। কিন্তু নতুন রাজ্যের আয়তনটা কীভাবে বের করলে, বলো না?”
“এটি তোমার জন্য একটি ধাঁধা,” দুষ্টু হাসি হাসে পিঁপ, “পরের বার যখন দেখা হবে, উত্তরটা জানাবে আমাকে।”
“ওহ,” একটু মনমরা হয় যেন ফারিন, কিন্তু পিঁপের মায়াকাড়া দুষ্টু চেহারা দেখে হেসে ফেলে, “আচ্ছা।”

[২]
তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাত, ১৫ই জানুয়ারি ২০১০
মেঘনা-তিতাসের বাঁক, ফারিনের গ্রামের বাড়ি, ড্রয়িংরুম

রাতের খাবার শেষে ভারী পোশাক গায়ে চাপিয়ে সবাই বসে আছি। আমার পাশে ফারিন, তার পাশে ফারিনের বড় বোন সারাকা, আর ওপাশে তাদের মা। তীব্র শীতে কাবু হয়ে পড়া এক রাত। কাঠালিচাঁপার গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। টিনের চালে টুপটাপ শিশিরের শব্দ, মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে প্যাঁচার ডাকে। আর বাতাসের বেগ বেড়ে গেলে ভেসে আসছে কৈবর্ত পাড়ার কীর্তনের বিষণ্ণ সুর; সেই সাথে আরো দূরে, মিটমিট আলোতে মেঘনার বুকে ছলছল জেলে নৌকার ছৈয়ের ভেতর থেকে ভাটিয়ালী গানের শব্দ।

আমার হাতে চায়ের কাপ। ফারিনের হাতেও, যদিও মেয়ের চা খাওয়া তেমন পছন্দ করেন না তার মা। তবে মাঝে মাঝে নিয়ম শিথিল হয়, আজকে সেরকম একটি সময়। আজ থেকে বেশ ক’বছর আগে, সারাকার জন্মের পর প্রথম বার তার মুখ দেখে হাসপাতালের বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম আমার জীবনের শেষ সিগারেটের প্যাকেটটি। তার কিছু দিন পর শুরু হয় চায়ের ব্যাপারটি। না, একটি নেশাকে কাটানোর জন্য আরেকটি নেশার আশ্রয় নয়; সিগারেট কাটানোর জন্য সারাকার কোমল মায়াবী মুখই যথেষ্ট ছিল। আমি আসলে সেসময় থেকে মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে শুরু করেছিলাম।

“আচ্ছা, বাবা, ধরো তোমাকে বিশাল একটি গুহায় ফেলে দেয়া হলো। উঁচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো গুহার দেয়াল, আর ভেতরটা মিশমিশে কালো, কোনো আলো নেই কোথাও।” হঠাৎ ফারিনের এ অদ্ভুত কথায় হাসতে শুরু করল সবাই। তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাতে জনমানবহীন অন্ধকার গুহায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার কল্পনা উষ্ণ চায়ের পেয়ালা হাতেও সুখপ্রদ কোনো ব্যাপার নয়; আমি দ্রুত গুহার ভেতর থেকে বের হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম আমার সমস্যাটি আসলে তার চেয়েও বড়।
“কীভাবে তুমি বুঝবে গুহাটা আকারে কত বড়?” ফারিনের প্রশ্ন এবার।
অন্ধকার গুহায় বসে তার ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রটি নিঃসন্দেহে তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসার উপায়টি থেকে অনেক বেশি জটিল। আমি মগ্ন হয়ে গেলাম চিন্তায়।

“আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে দেই,” ফারিন আশ্বস্ত করে আমাকে, “তুমি ইচ্ছে করলেই টিকটিকি বা তেলাপোকার মতো বুকে ভর দিয়ে গুহার দেয়ালের উপর চলতে পার। তবে তোমার সময় কিন্তু মাত্র দু’মিনিট।”
“একটা কাজ করা যায়,” নিজেকে স্পাইডারম্যানের মতো খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম আমি, “দেয়ালের পরিসীমা হিসেব করে মোটামুটি ক্ষেত্রফলটি বের করা যায়। যত বেশি পরিসীমা, তত বেশি ক্ষেত্রফল।”
“ওহ, তাই!” একটু যেন দমে যাওয়া কণ্ঠ ফারিনের, হয়তো বা সমাধানটির এতটা পরিষ্কার সারল্য আশা করেনি সে। তবু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবার জন্য টেবিল থেকে পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসলো।

আর তখনই আমার মনে পড়ে গেল কী হাস্যকর ভুলটিই না করেছি আমি, দ্রুত অপরিকল্পিত চিন্তার ফসল! “না, না, এভাবে হবে না,” অনেকটা চিৎকার করে উঠলাম। “কারণ শুধু পরিসীমার মানের উপরই ক্ষেত্রফল নির্ভর করে না, পরিসীমাটির আকৃতি কীরূপ, আয়তকার, বৃত্তাকার, ডিম্বাকার, না অন্য কোনোরূপ, এটিও একটি বড় ব্যাপার। যেমন, নিচের চিত্রে, আয়তকার ক ও খ গুহার পরিসীমা প্রায় সমান, প্রত্যেকটি ৬ ইঞ্চির কাছাকাছি, কিন্তু ক-এর ক্ষেত্রফল, খ-এর ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণ।

“এছাড়া গুহার ভেতর কোনো জায়গায় যদি খুব সরু, লম্বা ফাটল থাকে, তাহলে পরিসীমা অনেক বেড়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সে অনুযায়ী ক্ষেত্রফল তেমন নাও বাড়তে পারে।”
“হ্যাঁ, বাবা, এভাবে হবে না।” ফারিনের গলার স্বরে খুশির পরিবর্তনটি সুস্পষ্ট।

এবার আমার মনে পড়ে একাদশ শ্রেণীতে পড়া রসায়নের ক্লাসের কথা। স্পাইডারম্যান থেকে—না, রসায়নের ছাত্র নয়, বরং আবদ্ধ কোনো পাত্রে ছুটন্ত গ্যাসের অণু হয়ে গেলাম আমি, ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছি পাত্রের দেয়াল থেকে দেয়ালে। এক দেয়াল থেকে ধাক্কা খাবার পর গুণে যাচ্ছি কত কদম পর আবার আরেক দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছি। এভাবে অনেকক্ষণ ধরে একটি ধাক্কা ও তার পরবর্তী ধাক্কার মধ্যবর্তী দূরত্বের হিসেব রেখে একটি গড় দূরত্ব বের করা যায়, যার উপর ভিত্তি করে গড় মুক্ত-পথের (mean free path) সূত্র অনুযায়ী গুহার ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। গড় মুক্ত পথের দূরত্ব যত বেশি হবে, গুহার ক্ষেত্রফলও সে অনুযায়ী বেশি হতে থাকবে।

কাগজে বেলনাকৃতির জায়গায় একটি অণুর ছবি এঁকে সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম ফারিনকে।

বেশ মনোযোগ দিয়ে ছবিটি দেখার পর ফারিন বলল, “তার মানে এ পদ্ধতি কাজ করবে যখন গুহার দেয়ালের অভ্যন্তরটি বাঁধাহীন, মুক্ত হয়, তাই না?”
“হ্যাঁ, তাই।” সায় দিলাম আমি।
“কিন্তু, বাবা, মনে করো, গুহার মাঝ বরাবর খুব পাতলা একটা পর্দার মতো ঝুলিয়ে দেয়া হলো। পর্দার দু’পাশে একদম অল্প করে মাত্র জায়গা রাখা হলো যাতে তা গলে গুহার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে গুহার ক্ষেত্রফল তেমন কমলো না বললেই চলে, কিন্তু প্রাণীটি এখন আগের চেয়ে আরো তাড়াতাড়ি গুহার দেয়ালে ধাক্কা খেতে থাকবে, তাই না? আর তখন হিসেবেও ভুল হয়ে যাবে।”

মমতামাখা বিস্ময়ে আপ্লুত হলো আমার হৃদয়, একটু গর্ববোধও। আলতো করে নেড়ে দেই ফারিনের চুলগুলো। পৃথিবীতে আশাবাদী, সুখী হবার কতই না অসংখ্য অপার বিষয় রয়েছে আমাদের, এবং চারপাশে।

[৩]
শান্ত রোদের হিমেল সকাল, ১৬ই জানুয়ারি ২০১০
মেঘনা-তিতাসের বাঁক, ফারিনের গ্রামের বাড়ি, উঠোন

মেয়েদের অনুরোধে গণিত কাহিনী চলছে—
১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে, সর্বকালের অন্যতম সেরা গণিতবিদ গাউস জন্মগ্রহণ করেন যে বছর, বুগেই নামক ফরাসি বিস্কুট নিয়ে নিজ বাসগৃহে অদ্ভুত এক পরীক্ষা চালান ফ্রান্সের লুই লেকলার্ক কমতে দ্য ব্যুফন। হাতে বুগেই ধরে বৈঠকখানার দরজায় এসে দাঁড়ান ব্যুফন, তারপর কাঁধের উপর দিয়ে সেটি ছুঁড়ে মারেন পেছন দিকে, বৈঠকখানার ভেতরে। দরজা থেকে সরে এসে বুগেই খুঁজতে থাকেন তিনি, পাবার পর দেখে নেন কোথায় পড়েছিল তা। আয়তকার ফালিফালি তক্তা গায়েগায়ে ঠেকিয়ে বৈঠকখানার মেঝে মোড়ানো, তাদের পারস্পরিক সংযোগস্থলে হালকা চিড়। খাতায় টালিচিহ্নের সাহায্যে লিখে রাখেন ব্যুফন: কত বার তিনি বুগেই ছুঁড়লেন আর তাদের মাধ্যে কত বার বুগেইটি চিড়ের উপর পড়ল।

বেশ কিছুক্ষণ পরপর টালি যোগ করে যথাযথ সংখ্যাগুলো লিখে রাখছেন, সাড়ে তিন ঘন্টা পর নিচের টেবিলটি তৈরি হলো:

টেবিলের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ কী ভাবেন ব্যুফন, তারপর ডানপাশে আরও দুটি কলাম যোগ করে সেখানে কিছু ভাগের কাজ করেন:

সর্ব ডানের কলাম দেখে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠেন ব্যুফন, π = ৩.১৪১৫৯২…! ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী লাঠিবিস্কুট বুগেই আর কাঠের তক্তার সরলরৈখিক চিড়ের সাথে যুগযুগান্তরের রহস্যময় সংখ্যা π-এর কী সম্পর্ক থাকতে পারে!
“কিন্তু, বাবা, পাই তো জ্যামিতির বিষয়, বৃত্তের পরিধি আর ব্যাসের সম্পর্ক। এখানে তো ঘটনা হচ্ছে, একটি জিনিস কত বারের মধ্যে কত বার দাগে পড়ল; বৃত্ত তো দূরের কথা জ্যামিতিরই কিছুই নেই। এমনকি হতে পারে, ভাগফলটি এমনি এমনি পাই-এর কাছাকাছি মিলে গেল?” সারাকার চিন্তা ও প্রশ্ন আনন্দিত করে আমাকে।

“ব্যুফনও প্রথমে তাই ভেবেছিলেন, মামনি। তাই বিভিন্ন আকারের বুগেই নিয়ে পরীক্ষাটি করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবে আমরা বলতে পারি, তক্তার প্রস্থের (d) তুলনায় বুগেই-এর দৈর্ঘ্য (l) যত ছোট হবে, তত কমসংখ্যকবার এটি চিড়ের উপর পড়বে, অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ এটি কোনো একটি তক্তার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে, তাই না?”
“হ্যাঁ, বাবা। বুগেই ছোট হলে সে অনেক সময়ই পুরো তক্তা অতিক্রম করতে পারবে না, বিশেষ করে যখন আড়াআড়িভাবে পড়বে।”

“ব্যুফন বিস্ময়ে লক্ষ করেন যে, এই কমসংখ্যকবারটিও সুনির্দিষ্ট অনুপাতেই কমছে, ফলে l/d এবং n/N ও π-এর সম্পর্কটি থেকেই যাচ্ছে, এবং সম্পর্কটি নিম্নরূপ:

l ও d আমাদের সহজেই মেপে নিতে পারি, আর n ও N পরীক্ষার সময় লিখে রাখলেই হলো। সুতরাং এ পরীক্ষা থেকে সবসময় আমরা π-এর মান নির্ণয় করতে পারি।
ব্যুফনের প্রথম পরীক্ষায় বুগেইয়ের দৈর্ঘ্য ছিল তক্তার প্রস্থের অর্ধেক, অর্থাৎ l = d/2
=> d = 2l
এক্ষেত্রে (1) থেকে পাই,

, যা ব্যুফনের টেবিলের ডান কলামের সাথে মিলে যায়।
মনে রাখতে হবে, (1) সমীকরণটি সরাসরি সূত্রের সাহায্যেও প্রমাণ করা হয়েছে, যেখানে কোনো উপাত্তের দরকার নেই।”
“তারমানে এখানে সত্যিসত্যিই পাই আছে! কীভাবে সম্ভব!” বিস্ময় কাটে না মেয়ের।
“জগতের বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের বিভিন্ন জ্ঞান থাকলেও, মানুষ যখন গভীরভাবে জগতকে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন সম্ভবতঃ সে আবিষ্কার করে, জগতের সকল জিনিসের মধ্যে অনন্য এক একাত্মতা বিদ্যমান।” সারাকা কী বুঝল জানি না, কিন্তু দর্শন ছাড়া অন্য কোথাও তার উত্তর পাই না আমি।

ব্যুফনের চমকপ্রদ পরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন গণিতবিদগণ, বুগেইয়ের পরিবর্তে সূঁই নিয়ে, সূঁই রেখে বাকানো আংটি নিয়ে, আয়তাকার তক্তা বাদ দিয়ে কাগজে সমান্তরাল সরলরেখা টেনে, রেখাগুলোকে প্যাঁচিয়ে বক্ররেখা বানিয়ে, বিভিন্ন ধরণের জ্যামিতিক ক্ষেত্রে নানান জিনিস ছুঁড়ে দিয়ে দিয়ে—সুদৃঢ় হয় জ্যামিতিক সম্ভাব্যতার (Geometric Probability) ভিত্তি।

কিন্তু শুধু π-এর মান নিয়ে বসে থাকেন না গণিতবিদগণ। বিপরীতদিক দিয়েও অগ্রসর হন তারা: π, n, N, l-এসব থেকে বের করেন তক্তার প্রস্থ d, প্রস্থ থেকে নির্দিষ্ট সমান্তরাল রেখাংশের মধ্যবর্তী আবদ্ধ ক্ষেত্রফল A। এভাবেই এক সময় তাঁরা আবিষ্কার করেন,
কোনো একটি আবদ্ধ ক্ষেত্রে যদি এলোপাতাড়িভাবে প্রথমে একটি বক্ররেখা টানা হয়, তারপর ঐ ক্ষেত্রে এলোপাতাড়িভাবে আরেকটি বক্ররেখা টানা হয়, তাহলে দ্বিতীয় বক্ররেখাটি অনেক জায়গা দিয়ে প্রথমটিকে অতিক্রম করে যাবে এবং তাদের মধ্যে নিচের সম্পর্কটি পর্যবেক্ষণ করা যাবে:

যেখানে l1 প্রথম বক্ররেখার দৈর্ঘ্য, l2 দ্বিতীয় বক্ররেখার দৈর্ঘ্য, n বক্ররেখাদ্বয় যত বার পরস্পরকে ছেদ করেছে তার সংখ্যা এবং A হচ্ছে সেই আবদ্ধ ক্ষেত্রফল যেখানে এলোপাতাড়িভাবে রেখা দুটি আঁকা হয়েছে।

আর সে মুহূর্তে বিদ্যুত চমকের মতো আমার মনে পড়ল…

[৪]
উত্তুঙ্গ বাতাসের বিষণ্ণ বিকেল, ১৬ ই জানুয়ারি ২০১০
মেঘনা-তিতাসের বাঁক, কাশবনের ধার, গ্রামের জংলা ঝোঁপ

পাকুড় গাছের নিচে শুরু হয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে লক্ষ লক্ষ পিঁপড়া, লাইন ধরে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। ফারিন কাছে যেতেই থমকে দাঁড়ায় দলটি, বেঁকে যায় এক পাশে। কিছু তরুণ পিঁপড়া দাঁড়িয়ে যায় যুদ্ধংদেহি ভঙ্গিতে, হুল ফুটানোর প্রস্ততি নিচ্ছে। হঠাৎ দু’পাশে সরে যায় তরুণদের দলটি, রাজকীয় ভঙ্গিতে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে আসে পিঁপশঙ্ক।

স্নিগ্ধ হাসিতে উদ্ভাসিত হয় ফারিনের মুখ, হাতে তুলে নেয় পিঁপকে। ফারিনের হাতের তালুতে কিছুক্ষণ শুঁড় নাড়ে পিঁপ, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ছোট একটি মুকুট জ্বলজ্বল করছে তার মাথায়।

“নতুন রাজ্যে চলে যাচ্ছি আমরা। আমার নির্বাচিত রাজ্যই চূড়ান্ত হয়েছে।” আনন্দে ঝলমল করছে তার মুখ।
“নিজের জাতিকে পথ দেখিয়ে সামনে নিয়ে যাওয়া গৌরবের ব্যাপার, পিঁপ। তোমার গৌরব থাকুক সারা জীবন।” হাসিমুখে ফারিন বলে।
হাতের তালুতে শুঁড় বুলিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
“ওহ, হ্যাঁ। তোমরা কীভাবে নতুন রাজ্যের ক্ষেত্রফল বের কর, জানতে পেরেছি আমি।”
“তাই নাকি? বলো তো দেখি?” দুষ্টুমি খেলে যায় পিঁপের চোখে।
“প্রথমবার নতুন জায়গাটি পরীক্ষা করার সময় এলোমেলো কিন্তু নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের একটি ফেরোমেন ট্রেইল রেখে আস তোমরা। এ ট্রেইলটি তৈরি করতে বেশি সময় লাগে না তোমাদের। দ্বিতীয় বার আবার প্রবেশ কর জায়গাটিতে, এলোমেলোভাবে আরেকটি ট্রেইল বানাতে থাক, কিন্তু সেসময় যখনই প্রথমটিকে অতিক্রম কর, একটু থেমে হিসেব করে নাও, ফলে দ্বিতীয় ট্রেইলটি শেষ করতে বেশ সময় লাগে তোমাদের। এখন দ্বিতীয় ট্রেইলটি প্রথমটিকে যতবার অতিক্রম করে তার উপর ভিত্তি করে এলাকার ক্ষেত্রফল বের করে ফেল তোমরা।

সংক্ষেপে হিসেবটা হলো, দুই ট্রেইলের পারস্পরিক ছেদের সংখ্যা যত বেশি হবে, রাজ্যের ক্ষেত্রফল তত কম হবে [A এবং n পরস্পর ব্যস্তানুপাতিক]। আমাদের মতো কাগজ-কলম নিয়ে তো আর তোমরা হিসেব কর না, কিন্তু তোমাদের বিস্ময়কর মস্তিষ্কে রয়েছে জ্ঞান, যাকে অন্যেরা যা-ই বলুক, আমি বলব প্রগাঢ় শ্রদ্ধার গাণিতিক জ্ঞান; এর কারণে তোমরা পারস্পরিক ছেদের তথ্য থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষেত্রফল বের করে ফেল।”

গভীর আনন্দে শুঁড় নাচতে থাকে পিঁপের, গুঞ্জন উঠে পিঁপড়ার দলে। সুদক্ষ নেতার মতো দ্রুতই আত্মনিয়ন্ত্রণ চলে আসে পিঁপের ভেতর, ফারিনকে অনুরোধ করে মাটিতে নামিয়ে দেয়ার জন্য।

শেষ বিকেলের ম্লান আলোতে দীর্ঘতর হয় পাকুড় গাছের ছায়া, তার পাশ দিয়ে এগিয়ে চলে পিঁপড়ার দল, এক সময় হারিয়ে যায় ঢিবিতে। জগতে সবারই রয়েছে নিজের মতো জ্ঞান, আর তা-ই হলো সত্যিকারের জ্ঞান হদয়ে যা সৃষ্টি করে মমতার। ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে খুব সাবধানে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ফারিন।

About ম্যাভেরিক

Leave a Reply

Scroll To Top