Home / গণিত নিয়ে মজার কিছু / গড়গড় গড়াগড়ি-৩

গড়গড় গড়াগড়ি-৩

আগের পর্বটা শেষ করেছিলাম একটা প্রশ্ন দিয়ে। সেটার সমাধান দিয়েই এই পর্ব শুরু করা যাক। আগে আমরা হিসাব করে ফেলি, প্রথম কারখানার প্রত্যেক কর্মচারী দিনে কত টাকা মজুরী পায়।

প্রথম কারখানার মোট উৎপাদন = (১০০ + ১২৫ + ১৩৩) [ইচ্ছে করেই যোগফলটা বের করিনি]

প্রথম কারখানার কর্মচারীদের জন্য দৈনিক মজুরীর বরাদ্দ = (১০০ + ১২৫ + ১৩৩)*৪

প্রথম কারখানার প্রত্যেক কর্মচারীর জন্য দৈনিক মজুরীর বরাদ্দ = [(১০০ + ১২৫ + ১৩৩)*৪] / ৩

এই জিনিসটিকে একটু অন্যভাবে সাজিয়ে আমি লিখতে চাই, [(১০০ + ১২৫ + ১৩৩)/৩] *৪

 

যদি দ্বিতীয় কারখানার জন্য হিসাব করা হয়, তাহলে সেটা দাঁড়াবে, [(১৩০ + ১৫০ + ১৬২ + ১৫৮)/৪]*৪

এই ভিন্নভাবে লেখার কারণ আসলে এই সমস্যাটাকে একটু অন্যভাবে interpret করা। যদি দুই কারখানাতেই প্রত্যেক কর্মচারীর দৈনিক মজুরীর পরিমাণটার দিকে তাকাই তাহলে সেটা থেকে একটা সুন্দর জিনিস লক্ষ করা যায়।

 

প্রত্যেক কর্মচারীর মজুরী তার কারখানায় প্রতিটি মেশিন গড়ে যে কয়টি সাবান তৈরি করে তার চারগুণ।

 

যদি অধিকাংশ কর্মচারীর বেতন বাড়াতে হয়, তাহলে তার কারখানার গড় উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু মোট উৎপাদন তো আর পরিবর্তন করা যাচ্ছে না। তাহলে? লক্ষ করে দেখুন, আমার কাজ হলো প্রত্যেক কারখানার মেশিনগুলোর গড় উৎপাদন বাড়ানো। কারখানা দুটোর মেশিনগুলোর গড় উৎপাদন বের করলে এর উত্তর পেতে আমাদের সুবিধা হবে।

 

 

প্রথম কারখানার মেশিনগুলোর গড় উৎপাদন হলো ১১৯.৩৩

দ্বিতীয় কারখানার মেশিনগুলোর গড় উৎপাদন হলো ১৫০

 

এই সাতটি মেশিনের মধ্যে একটি আছে যেটির দৈনিক উৎপাদন প্রথম কারখানার মেশিনগুলোর গড় উৎপাদনের চেয়ে বেশি, তবে দ্বিতীয় কারখানার মেশিনগুলোর গড় উৎপাদনের চেয়ে কম। এই মেশিনটাই হতে পারে আমাদের তুরুপের তাস। এটাকে যদি প্রথম কারখানায় শিফট করা হয় তাহলে কিন্তু প্রথম কারখানার গড় উৎপাদন বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে প্রথম কারখানার মেশিনগুলোর নতুন গড় উৎপাদন হবে ১২২। তবে এই স্থানান্তর দ্বিতীয় কারখানার শ্রমিকদের জন্যও বেশ লাভজনক (একজনের কথা বাদ দিলে)। তাদের কারখানা থেকে below average মেশিনটাই সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। তাদের মেশিনগুলোর গড় উৎপাদনও কিন্তু এখন বাড়বে। এখন দ্বিতীয় কারখানার মেশিনগুলোর নতুন গড় উৎপাদন হবে ১৫৬.৬৭। সুতরাং ঐ কারখানার তিনজন কর্মচারীদের বেতনটাও বাড়বে।

 

[সবার বেতন বেড়ে গেলেও কিন্তু একজনের বেতন কমে যাচ্ছে। শুধু বেতন কমলে তাও হয়তো হতো, আসলে তার বেতন কমিয়েই অন্যদের বেতন বাড়ানো হচ্ছে। যদি ঐ কর্মচারী সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পায় তাহলে কেলেংকারি বেঁধে যাবে]

 

যাই হোক, উদাহরণটা খুব বেশি ভালো নয়। তবে এটা থেকে যেটা বোঝাতে চেয়েছি সেটা হলো- একটা ছোট পরিবর্তনই অনেক ভালো কিছু ঘটাতে পারে। শুনতে খুব ভালো শুনাচ্ছে? হুম, কথাটা বেশ কাজের। আসলেই এটা হতে পারে। তবে অনেক সময় এই ‘ভালো’টা আসলে ভালো কিছু নয়, শুধুই একটা প্রহেলিকা।

 

দুটো সেটের উপাদানগুলোর মাঝে একটা সেট থেকে একটি উপাদান অন্য সেটে জুড়ে দিলে যে দুই সেটের উপাদানগুলোর গড়ই বেড়ে যেতে পারে সেটার একটা গালভরা নাম আছে- এটাকে বলে উইল রজার্স ফেনোমেনন। নামটা বেশ ভারী, তবে নামকরণের কারণটা আবার এতটা ভারী নয়। উইল রজার্স ঊনিশ শতকের শুরুর দিকের একজন আমেরিকান কৌতুকাভিনেতা। তিনি ওকলাহোমা স্টেটে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর একটি কৌতুক ছিল- “যদি ওকলাহোমার কোন বাসিন্দা ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করতে যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে- দুই স্টেটেরই এভারেজ আই কিউ আসলে বেড়ে গেছে।”

 

[যদি (আশা করি কারো জন্যই এই কথাটা সত্যি নয়) কেউ এই কৌতুকের অর্থ বুঝে না থাকেন তাহলে প্রথম কমেন্ট দেখুন]

 

এই সাধারণ একটি কৌতুকের জন্য উইল রজার্সের নামে একটা আলাদা ‘ফেনোমেনন’ ঘোষণা করার কারণটা কিন্তু বেশ সিরিয়াস। সেটার জন্য আমাদের একটু চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে যেতে হবে। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের দেহে ক্যান্সার আসলে কতটা ছড়িয়ে পড়েছে সেটা স্টাডি করার জন্য রোগীদেরকে কয়েকটা স্টেজে ভাগ করা হয়। চিহ্নিত উপসর্গ এবং ডায়াগোনসিসের ভিত্তিতে রোগীদের বিভিন্ন স্টেজে ভাগ করা হয়। ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকলে একজন রোগী এক স্টেজ থেকে আরেক স্টেজে চলে আসেন। এটাকে বলে স্টেজ মাইগ্রেশন। এই স্টেজ মাইগ্রেশনের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন স্টেজে থাকা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের গড় আয়ুষ্কাল বেড়ে যেতে পারে। একজন রোগী যদি প্রথম স্টেজ থেকে দ্বিতীয় স্টেজে চলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে প্রথম স্টেজে থাকা রোগীদের চেয়ে তার শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল। সুতরাং, প্রথম স্টেজের অন্যদের চেয়ে তার সম্ভাব্য আয়ু কম। সে যদি প্রথম স্টেজ থেকে দ্বিতীয় স্টেজে আসে তাহলে প্রথম স্টেজের অন্য রোগীদের গড় আয়ু বেড়ে যাবে। একইভাবে, যেহেতু সে দ্বিতীয় স্টেজে নতুন নতুন শিফট করেছে, দ্বিতীয় স্টেজের অন্যদের তুলনায় তার সম্ভাব্য আয়ু বেশি হবে, সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্টেজের রোগীদের গড় আয়ুও বেড়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে রোগীদের অবস্থার কিন্তু আসলে কোন উন্নতিই ঘটেনি। শুধু রোগীদের গ্রুপিং করার নিয়মের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, দুই গ্রুপের অবস্থাই ভালো হয়ে গেছে।

 

এই ঘটনা বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে যদি নতুন কোন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার সময় আমরা স্টেজ মাইগ্রেশনের ফাঁদের পা দিয়ে বসি। শুধু স্টেজ মাইগ্রেশনই নয়, স্টেজিং করার ক্ষেত্রে যদি আমরা এর আগে ব্যবহার করে থাকা স্ট্যান্ডার্ডগুলোর পরিবর্তন করি কিংবা রোগীদের ডায়াগোনসিসের ক্ষেত্রে উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহার করি তাহলেও এটা হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগের বিভিন্ন পরীক্ষায় পাওয়া উপাত্তের তুলনায় নতুন পরীক্ষায় পাওয়া উপাত্ত অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক হতে পারে। সেটা থেকে হয়তো এ সিদ্ধান্তেও চলে আসা যেতে পারে যে নতুন ওষুধটা আসলেই ভালো। তবে সেটা বাস্তবতা নাও হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ১৩৫০ জন স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর উপর পরীক্ষা চালিয়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের Dr. Wendy Woodward এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র স্টেজ মাইগ্রেশনের জন্যই দ্বিতীয় স্টেজের স্তন ক্যান্সার রোগীদের গড় আয়ুষ্কাল ২০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

 

উইল রজার্স ফেনোমেনন নিয়ে এই পর্যন্তই। এই পর্ব এখানেই শেষ করছি। দ্বিতীয় পর্বের যে প্রশ্নটার উত্তর এখনো দেওয়া হয়নি, সেটি নিয়েই আলোচনা করবো এই সিরিজের শেষ পর্বে।

 

লেখকঃঅসংজ্ঞায়িত আমি

About I dont love math

One comment

  1. ‎**ওকলাহোমা স্টেটের সবচেয়ে কম আই কিউ যুক্ত মানুষগুলোর আই কিউ আসলে ক্যালিফোর্নিয়ার এভারেজ আই কিউ যুক্ত মানুষের চেয়ে বেশি

Leave a Reply

Scroll To Top