Home / গণিত নিয়ে মজার কিছু / গড়গড় গড়াগড়ি-২

গড়গড় গড়াগড়ি-২

একটা উদাহরণ দিয়েই সরাসরি শুরু করা যাক। ধরে নাও, ক্লাসের ৫০ জন মিলে পিকনিকে যাচ্ছ। এখন, পিকনিকের খরচের তালিকাটা হিসেব করে দেখলে এমন-

বাস ভাড়া- ৪০০০ টাকা

খাওয়া দাওয়া- ৭৫০০ টাকা

সাউন্ড সিস্টেম- ৩০০০ টাকা

গিফট আইটেম- ৬০০০ টাকা

তো এখানে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে ২০,৫০০ টাকা। এই খরচটা কিন্তু সবার জন্য সমান। সুতরাং সবাইকে সমানভাবে এই খরচটা বহন করতেই হবে। সে হিসেবে প্রত্যেককে দিতে হবে ৪১০ টাকা করে।

 

এখন ধর, তোমরা সিদ্ধান্ত নিলে তোমরা লটারির আয়োজন করবে। লটারির জন্য প্রত্যেককে একটা করে কুপন দেওয়া হবে। লটারি করার সময় ৫০টা কুপন থেকে ৩টা কুপন তুলে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পুরস্কার দেওয়া হবে। এই পুরস্কারগুলো দেওয়ার জন্য খরচ হবে ২০০০, ১০০০ এবং ৫০০ টাকা।

 

পিকনিকের মোট খরচ গেল বেড়ে। এখন খরচ হবে ২৪,০০০ টাকা। নতুন যে খরচটা যোগ হলো সেটা কিন্তু সবার জন্য সমান ভাবে খরচ হবে না। কিন্তু এই খরচের টাকাটা তো চাদা তুলেই জোগাড় করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো- সবাই কি এখনো সমানভাবে খরচ বহন করবে?

 

একটু চিন্তা করলেই আন্দাজ করা যায়, সবার সমানভাবে খরচটা ভাগ করে নেওয়াটাই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। কারণ লটারি হওয়ার আগ পর্যন্ত তো কারো জেতার ‘চান্স’ বেশি বা কম নয়, তো খরচটাই বা বেশি বা কম হতে যাবে কেন? আর ঐ যে বলেছিলাম, গড় যোগফলকে ঠিক রেখে সংখ্যাগুলোকে সমান করে দেয়। তো যোগফল ঠিক রাখতে গেলে তো গড় করতেই হবে।

 

কিন্তু একটা ব্যাপার হলো, এখানে গড় হলো ৪৮০ টাকা করে। তো লটারির পুরস্কার যারা পাবে, তাদের জন্য খরচ হবে ২৪১০, ১৪১০ আর ৯১০ টাকা। আর বাকিদের জন্য খরচটা হলো ৪১০ টাকা করে। আগের তো বলেছিলাম, গড় মানে হলো ‘সাধারণত’ যেটা ঘটে সেটার একটা হিসাব। এখানে কারোর জন্যই তো খরচ ৪৮০ টাকার আশেপাশে না। কারো কারোটা অনেক বেশি, আর বাকিদেরটা কম।

 

এখানে কিছু কথা বলার আছে। সেটা নিয়ে আবারএকটু পরে ফিরবো। গড় যোগফলকে ঠিক রাখে, এটা নিয়ে একটা মজার সমস্যা দেখা যাক। সমস্যাটা art and craft of problem solving বইয়ের অনুশীলনীতে। সমস্যাটা আমাকে প্রথম দেখায় মোহাইমিন। সমস্যাটা হলো-

 

একটা ঘরে পাঁচজন নাকউঁচু প্রফেসর আছেন। এরা সবাই জানতে চান তাদের নিজেদের আয় কি ‘ভালো’ না ‘খারাপ’। তো তারা ঠিক করলেন, তারা তাদের বেতনের গড় বের করবেন। যদি তার নিজের বেতন গড়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ধরে নেবেন, তার আয় ‘ভালো’ নাহলে তার আয় ‘খারাপ’।

তবে তারা কাজটা এমনভাবে করতে চান যেন কেউই অন্য কারো বেতন জানতে না পারেন। বেতন তো দূরে থাক, তারা এই প্রক্রিয়া থেকে তাদের বেতন সম্পর্কে কোন কার্যকর তথ্যই প্রকাশ করতে চান না। তিনজনের বেতন ৫০০০০ টাকার উপরে, কিংবা দুজনের বেতন ভালো এধরনের কোন তথ্য যেন কেউ না জানে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বেতনের গড় বের করার কাজটা কীভাবে করা যেতে পারে?

 

[সমাধান দেখার আগে নিজে ভেবে বের করার চেষ্টা করুন]

 

কেউই নিজের বেতন জানাবেন না, এটা স্পষ্ট। তো পাঁচজন প্রফেসর পাঁচ টুকরো কাগজ নিয়ে নিজের ইচ্ছে মত একটা বেতন লিখবেন। কিন্তু এতে তো গড় ঠিক থাকবে না। গড় ঠিক থাকার জন্য যোগফল ঠিক রাখতে হবে। এখন এমন কিছু একটা করতে হবে যেন যোগফল ঠিক থাকে। তো এক কাজ করা যাক, চিরকুট পাঁচটা নিয়ে এলোমেলো করে আবার পাঁচজনের হাতে পাঁচটা চিরকুট ধরিয়ে দেবে। এবার তাদের কাজ কী হবে? ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়া। মানে আগেরবার যে যত টাকা বাড়িয়ে বা কমিয়ে লিখেছেন, তত টাকাই ঐ চিরকুটে থাকা সংখ্যাটা থেকে বিয়োগ বা যোগ করে দেবেন। তো, হয়ে গেল। এবার সবার চিরকুটের সংখ্যাটা যোগ করে তার গড় নিলেই হয়ে যাবে।

 

 

এই সমস্যাটার যে সমাধান আমরা করলাম, সেটা একটা উদাহরণ দিয়ে আমরা দেখার চেষ্টা করি। ধরা যাক, পাঁচ প্রফেসরের বেতন হচ্ছে ৫০, ৩৫, ৪২, ৫৬, ৩৩ হাজার টাকা। আর এরা লিখলেন ৭৫, ৯০, ২, ১০, ৬১ হাজার টাকা।

এখন এই কাগজগুলো এলোমেলো করার পর পাঁচজনের হাতে গিয়ে যথাক্রমে ২, ৬১, ৭৫, ১০, ৯০ হাজার লেখা কাগজগুলো পড়লো।

প্রথম প্রফেসর তার বেতন (৭৫ – ৫০) = ২৫ হাজার বাড়িয়ে বলেছিলেন। এখন তিনি নতুন চিরকুট থেকে সেটা কমিয়ে দেবেন। অর্থ্যাৎ, ২ হাজার থেকে ২৫ হাজার কমিয়ে লিখে দেবেন (২ – ২৫) =  –২৩ হাজার টাকা। (বেতন ঋণাত্মক হয়ে গেল নাকি!!!)

একইভাবে পরের চারজন তার চিরকুটের সংখ্যাগুলোকে বদলে লিখবেন ৬, ১১৫, ৫৬, ৬২ হাজার টাকা।

এই পাঁচটার গড় হলো (-২৩ + ৬ + ১১৫ + ৫৬ + ৬২)/৫ =৪৩.২ হাজার টাকা (৪৩,২০০ টাকা)। মূল বেতনগুলোর গড় করে দেখ, ঠিক এটাই আসবে।

 

এই জায়গায় একটা ব্যাপার খুব খুব খুবই লক্ষণীয়, গড় সম্পর্কে জানার জন্য যে একটা জিনিসই আসলে জানা লাগে, সেটা হলো সংখ্যাগুলো যোগফল। আর কোন তথ্য জানাটা মোটেই জরুরী না। এখন একটা প্রশ্ন তুমি করতেই পারো, যদি গড় জানার জন্য সংখ্যাগুলো কত সেটা জানা যদি জরুরি না হয়, তাহলে গড় থেকে আমরা কীভাবে ধারণা পাই, সংখ্যাগুলো আসলে ‘সাধারণত’ কার কাছাকাছি থাকে? গড় যদি আসলেই আমাদেরকে বলে দিতে পারে যে সংখ্যাগুলো ‘সাধারণত’ কার আশেপাশে থাকে তাহলে সেটা সে করে কীভাবে?

 

এটার উত্তর দেবো, তবে একটু অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে গড়ের আরেকটা মজার দিক দেখে এই পর্বের ইতি টানা যাক।

 

একদম সহজ একটা প্রশ্ন- ২, ৫, ৮ এর গড় কত? উত্তরটাও সহজ- (২ + ৫ + ৮)/৩ = ৫ । এখন যদি বলা হয়, এই সংখ্যাগুলোর সাথে আমরা ১ কে সাথে নিয়ে গড় করলে গড় বাড়বে নাকি কমবে? উত্তরটা ট্রিভিয়াল, আলবত কমবে। যদি এখানে ১ এর বদলে ৯ নিয়ে কাজ করা হতো তাহলে? সেক্ষেত্রে কিন্তু গড় বেড়ে যাবে।

 

সাধারণভাবে, গড়ের চেয়ে ছোট কোন সংখ্যা গড়ের হিসেবে নিয়ে আসলে গড় কমে যায়। আর গড়ের চেয়ে বড় কোন সংখ্যা গড়ের হিসেবে নিয়ে আসলে গড় যায় বেড়ে। (আমাদের অবশ্য এটা বুঝতে পারার কষ্ট হওয়ার কথা না, কতগুলো অসাধারণ ইনিংস খেলার পরেও মোহাম্মদ আশরাফুলের গড় যে কেন এত খারাপ, ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালিমাত্রই সেটা মনে প্রাণে জানেন)

 

 

এই যে গড় বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়ার হিসাব, সেটা থেকে আমরা একটা মজার কাজ করতে পারি। ধরা যাক, একটা সাবান তৈরির কোম্পানির দুটা কারখানা আছে। প্রথম কারখানায় তিনটা মেশিন আছে, যেগুলোতে প্রতিদিন ১০০, ১২৫ আর ১৩৩টা করে সাবান তৈরি হয়। দ্বিতীয় কারখানায় চারটা মেশিন আছে, সেগুলোতে ১৩০, ১৫০, ১৬২ এবং ১৫৮টা করে সাবান তৈরি হয়। প্রতিটা মেশিন চালানোর জন্য একজন করে কর্মচারী নিয়োগ করা আছে। যেকোন একটা কারখানার কর্মচারীদের প্রতিদিনের মজুরীর জন্য যে বরাদ্দ সেটা ঐ কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদিত সাবানের সংখ্যার চারগুণ। একটা কারখানার জন্য বরাদ্দ করা মোট মজুরী ঐ কারখানার সব কর্মচারীর মাঝে সমান ভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে।

প্রশ্ন হলো, কী করলে মোট উৎপাদন না বাড়িয়েও অধিকাংশ কর্মচারীর বেতন বাড়ানো সম্ভব? নতুন কোন মেশিন কেনা বা পুরোনো কোন মেশিন বেঁচে দেওয়া যাবে না।

 

আজকে আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। সমাধানটা নিয়ে একটু ভাবেন, আমি পরের পর্বে সেটা লিখব।

 

লেখকঃঅসংজ্ঞায়িত আমি

About I dont love math

2 comments

  1. ভালো ই লাগতেসে ….দেখি আর নতুন কি আসে …

  2. উত্তর: সবগুলো মেশিনে সমান সংখ্যক সাবান তৈরি করে?

Leave a Reply

Scroll To Top