Home / প্রতিবেদন / অবাক গণিত / ‘গণিত’- বিস্ময়ের কারখানা

‘গণিত’- বিস্ময়ের কারখানা

শুরু করা যাক একটা মজার গল্প দিয়ে- এক দিন এক লোক একটা ধাঁধাঁ নিয়ে এক গণিতবিদের কাছে আসলেন, তার ধাধা হলো- ৩ জন জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে গেছে। মাছ ধরে ক্লান্ত হয়ে রাতের বেলা এক দ্বীপে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। রাতে একজনের ঘুম ভেঙ্গে গেল, সে মাছ গুলো তিন ভাগ করতে গিয়ে একটা বাড়তি মাছ পেয়ে সমুদ্রে ফেলে দিল এবং নিজের এক ভাগ নিয়ে চলে গেল। ২য় জনের ঘুম ভাঙ্গার পর সে ও একই কাজ করল, মাছ গুলো তিন ভাগে ভাগ করে একটা বাড়তি মাছ ফেলে দিয়ে নিজেরটা নিয়ে গেল। ৩য় জন ও একই কাজ করল। এখন প্রশ্ন হল- সর্বনিম্ন কতটি মাছ হলে এভাবে ভাগ করা সম্ভব। গণিতবিদ মনোযোগ দিয়ে প্রশ্নটি শুনলেন, একমুহুর্ত চিন্তা করে বললেন, -2 টি মাছ হলেই চলে!! প্রশ্নকর্তা হতবাক। সে আশা করেছিল প্রচলিত উত্তর (25),মাছ কিভাবে “-2″ হবে সেটা তাকে কে বোঝাবে? গাণিতিক ভাবে তার উত্তর একেবারেই নিখুঁত। ১ম জেলে -2 টি মাছ ভাগ করতে গিয়ে একটা ফেলে দিল- মাছ হল -3 [-2-(+1)] টি। এখান থেকে সে -1 টি মাছ নিয়ে গেলে -2[-3-(-1)] টি মাছ থাকল, ২য় এবং ৩য় জনও একই কাজ করবে এবং তার পরও -2 টি মাছ থাকবে !! অনেকে মনে করতে পারেন এই গল্প বুঝি বানানো। এটা মোটেও মানানো গল্প না।আলোচ্য গণিতবিদ হলেন নোবেল বিজয়ী পল ডিরাক যিনি সর্বপ্রথম অ্যান্টিম্যটার বা প্রতিপদার্থের ভবিষৎবানী করেছিলেন।এখন আমরা বুঝতে পারি তাঁর মাথায় এমন অদ্ভূত সমাধান কিভাবে এলো। এখানেই হলো গণিতের মজা। একটা সমাধান যত অদ্ভুতই হোক না কেন, সেটা গাণিতিক ভাবে ঠিক থাকলেই হলো।

আরো  মজার ব্যাপার ঘটে কাল্পনিক সংখ্যার বেলায়। নামটার মাঝেই অন্যরকম ভাব, “কাল্পনিক” যে সংখ্যা কল্পনায় সেটাকে নিয়ে আবার অঙ্ক করে কিভাবে? প্রশ্নটার মত উত্তরটাও মজার। বাস্তবের মাঝে একটা কল্পনা আনলে আরেকটা বিপরীত কল্পনাও আনা হয়। শেষে দেখা যায় কল্পনা গুলো নিজে নিজেই চলে যায়। ছোট্ট একটা উদাহরন দেয়া যাক। যদি বলা হয় 8 কে এমন দুই ভাগে ভাগ করতে হবে যাদের গুনফল হবে 24। 8 খুব বেশি বড় সংখ্যা না,তাই ভাগ করা শুরু করে দেই,

8=1+7; 1×7=7

8=2+6; 2×6=12

8=3+5; 3×5=15

8=4+4; 4×4=16

তাহলে দেখা গেল 16 এর বেশি পাওয়া গেল না। আমরা এক কাজ করি, এই ভাবে অংকটা করার চেষ্টা করি-

8=4+4

=(4+x)+(4-x)

মনে করি, (4+x).(4-x)=24

4^2-x^2=24

x^2=16-24

x^2=-8

x= \sqrt{-8}

তাহলে (4+\sqrt{-8}) আর (4-\sqrt{-8}) এই দুইটি সংখ্যা গুন করলেই পাবো 24 আর যোগ করলে পাবো 8.এই সংখ্যা ২ টি কাল্পনিক। আর কল্পনাটুকু শুধু \sqrt{-8}। আরোও ভালভাবে বলতে গেলে কল্পনা শুধু \sqrt{-1}। কারণ \sqrt{-8} কে এইভাবে লিখলে- \sqrt{8}\ldots\sqrt{-1}এখানে \sqrt{8} = 2\sqrt{2} তো আর কল্পনা না, কল্পনা শুধু মাত্র \sqrt{-1} আর এই ছোট কল্পনাকেই মেনে নিতে কত ঝামেলাই না হয়েছিল এককালে। ষোড়শ শতাব্দীর গণিতবিদেরা এটাকে লক্ষ্য করলেও গোলমেলে ব্যাপার বলেই উড়িয়ে দেন। কিন্তু এই গোলমেলে ব্যপারটাই কেন জানি মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠে। যেমন- ax^2+bx+c=0 এই ধরণের দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান আমরা জানি

x = \dfrac{-b  \pm \sqrt{b^2-4ac}}{2a}

মজার ব্যপারটা হচ্ছে এই সমাধানের b^2-4ac এর মান যদি 0 এর চেয়ে ছোট হয় তাহলেই হুট করে হাজির হয় সেই গোলমেলে সংখ্যা  \sqrt{-1}। কালে কালে দেকার্তে, নিউটনের মত বড় বড় গণিতবিদ কর্তৃক অপমানিত হয়ে বেচারা যখন দুঃখে ভারাক্রান্ত, তখন অয়লার  এই বেচারাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সুন্দর একটা নামও দিলেন, নামটা হল i। শুধু তাই না, i কে নিয়ে একটা মজার সমীকরণ ও লিখে ফেললেন-

 e^{i \pi} +1=0

সমীকরণটার আলাদা একটু গুরুত্ব আছে কারণ গণিতের সব গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা গুলোর সাথে i কেও যুক্ত করা হয়েছে।

এই গেল কাল্পনিক সংখ্যার কথা বার্তা।

এখন আরোও কিছু মজার অংক করি।  x=2+\dfrac{15}{2+\dfrac{15}{2+\dfrac{15}{2+ \ldots\ldots\ldots}}}

এই ভগ্নাশটা এইভাবেই অসীম পর্যন্ত চলছে, x এর মান বের করি এবার। এখানে প্রথম ভগ্নংশের হরে আবার মূল ভগ্নাংশটাই চলে আসে। সুতরাং –

 x=2+\dfrac{15}{x}

=> x= \dfrac{2x+15}{x}

=> x^2=2x+15

=> x^2-2x-15=0

=> x^2-5x+3x-15=0

=> (x-5)(x+3)=0

=> x=5,-3

তাহলে দেখা গেলো অসীম ভাবে চলমান একটা ভগ্নাংশের মান নির্দিষ্ট। হয় 5 হবে, নাহলে -3 হবে। যত ইচ্ছা বড় করলেও এর বাইরে কিছু পাওয়া যাবে না।

একই রকম আরেকটা অংক করা যাক,  x=1+\dfrac{1}{1+\dfrac{1}{1+\dfrac{1}{1+\ldots\ldots\ldots}}}

এটাকে আগের মত করে সমাধান করলে শেষে পাবো, x^2-x-1=0। পরিচিত দ্বিঘাত সমীকরণ।দ্বিঘাত সমীকরণের সুত্র দিয়ে খুব সহজেই x এর মান বের করা যায়, x = \dfrac{-b  \pm \sqrt{b^2-4ac}}{2a}। এখানে, a=1, b=-1,c=-1, তাহলে x এর মান হবে হয় x = \dfrac{ 1+\sqrt{5}}{2} অথবা x = \dfrac{ 1-\sqrt{5}}{2}। এই দুইটি মানই নির্দিষ্ট কিন্তু একটু মজা আছে। x = \dfrac{ 1+\sqrt{5}}{2} কে আমরা কখনোই দশমিক ভগ্নাংশে লিখতে পারব না কারণ এটা অমূলদ সংখ্যা।x = \dfrac{ 1+\sqrt{5}}{2}=1.6180339887…. এভাবে চলতেই থাকবে।এই সংখ্যাটার আবার বিশেষ একটা নাম আছে, এটাকে বলা হয় “গোল্ডেন রেশিও” বা সোনালী অনুপাত। আর বাকি আরেকটা যে মান আছে সেটারোও একই আবস্থা, x = \dfrac{ 1-\sqrt{5}}{2}=-0.6180339887….  এটাও অমুলদ সংখ্যা।অদ্ভূত ব্যাপার, এক ধরণের অসীম থেকে আবার অন্য ধরণের অসীম পেয়ে গেলাম।

শেষ করব ধারা দিয়ে,  1+\dfrac{1}{2}+\dfrac{1}{4}+\dfrac{1}{8}+………….+ \infty । এই অসীম ধারার যোগফল কত? উত্তরটা অসীম হওয়া উচিত, কিন্তু উত্তর হল 2।

আরেকটা ধারা দেখা যাক, 1+\dfrac{1}{2}+\dfrac{1}{3}+\dfrac{1}{4}+………….+\infty, এটাও অসীম ধারা যার যোগফল অসীম। আমি এখানে প্রমান করলাম না কারণ ম্যাভেরিক ভাই “রামানুজন—গণিতের মহত্তম শিল্পী এক” পোষ্টে অনেক সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছেন।

About রিমন

8 comments

  1. just jossss…kisu bapar jantam bt oita ke arektu notun kore janlam..thnx

  2. মরুভূমির জলদস্য

    চমৎকার উপস্থাপনা আর সহজ লেখার ধারা লেখাটিকে করেছে আরো স্বাচ্ছন্দময়।
    ভালো লাগলো খুব।

Leave a Reply

Scroll To Top