Home / গণিত নিয়ে মজার কিছু / মজার সমস্যা / গণিত বিষয়ক ফিকশান: পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (পর্ব ২)

গণিত বিষয়ক ফিকশান: পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (পর্ব ২)

গণিত বিষয়ক ফিকশান: পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান পর্ব ১:দেখতে এখানে ক্লিক করুন

 পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান[২] তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাত, ১৫ই জানুয়ারি ২০১০
মেঘনা-তিতাসের বাঁক, ফারিনের গ্রামের বাড়ি, ড্রয়িংরুম

রাতের খাবার শেষে ভারী পোশাক গায়ে চাপিয়ে সবাই বসে আছি। আমার পাশে ফারিন, তার পাশে ফারিনের বড় বোন জেরিন, আর ওপাশে তাদের মা। তীব্র শীতে কাবু হয়ে পড়া এক রাত। কাঠালিচাঁপার গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। টিনের চালে টুপটাপ শিশিরের শব্দ, মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে প্যাঁচার ডাকে। আর বাতাসের বেগ বেড়ে গেলে ভেসে আসছে কৈবর্ত পাড়ার কীর্তনের বিষণ্ণ সুর; সেই সাথে আরো দূরে, মিটমিট আলোতে মেঘনার বুকে ছলছল জেলে নৌকার ছৈয়ের ভেতর থেকে ভাটিয়ালী গানের শব্দ।

আমার হাতে চায়ের কাপ। ফারিনের হাতেও, যদিও মেয়ের চা খাওয়া তেমন পছন্দ করেন না তার মা। তবে মাঝে মাঝে নিয়ম শিথিল হয়, আজকে সেরকম একটি সময়। আজ থেকে বেশ ক’বছর আগে, জেরিনের জন্মের পর প্রথম বার তার মুখ দেখে হাসপাতালের বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম আমার জীবনের শেষ সিগারেটের প্যাকেটটি। তার কিছু দিন পর শুরু হয় চায়ের ব্যাপারটি। না, একটি নেশাকে কাটানোর জন্য আরেকটি নেশার আশ্রয় নয়; সিগারেট কাটানোর জন্য জেরিনের কোমল মায়াবী মুখই যথেষ্ট ছিল। আমি আসলে সেসময় থেকে মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে শুরু করেছিলাম।

“আচ্ছা, বাবা, ধরো তোমাকে বিশাল একটি গুহায় ফেলে দেয়া হলো। উঁচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো গুহার দেয়াল, আর ভেতরটা মিশমিশে কালো, কোনো আলো নেই কোথাও।” হঠাৎ ফারিনের এ অদ্ভুত কথায় হাসতে শুরু করল সবাই। তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাতে জনমানবহীন অন্ধকার গুহায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার কল্পনা উষ্ণ চায়ের পেয়ালা হাতেও সুখপ্রদ কোনো ব্যাপার নয়; আমি দ্রুত গুহার ভেতর থেকে বের হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম আমার সমস্যাটি আসলে তার চেয়েও বড়।
“কীভাবে তুমি বুঝবে গুহাটা আকারে কত বড়?” ফারিনের প্রশ্ন এবার।
অন্ধকার গুহায় বসে তার ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রটি নিঃসন্দেহে তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসার উপায়টি থেকে অনেক বেশি জটিল। আমি মগ্ন হয়ে গেলাম চিন্তায়।

“আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে দেই,” ফারিন আশ্বস্ত করে আমাকে, “তুমি ইচ্ছে করলেই টিকটিকি বা তেলাপোকার মতো বুকে ভর দিয়ে গুহার দেয়ালের উপর চলতে পার। তবে তোমার সময় কিন্তু মাত্র দু’মিনিট।”
“একটা কাজ করা যায়,” নিজেকে স্পাইডারম্যানের মতো খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম আমি, “দেয়ালের পরিসীমা হিসেব করে মোটামুটি ক্ষেত্রফলটি বের করা যায়। যত বেশি পরিসীমা, তত বেশি ক্ষেত্রফল।”
“ওহ, তাই!” একটু যেন দমে যাওয়া কণ্ঠ ফারিনের, হয়তো বা সমাধানটির এতটা পরিষ্কার সারল্য আশা করেনি সে। তবু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবার জন্য টেবিল থেকে পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসলো।

আর তখনই আমার মনে পড়ে গেল কী হাস্যকর ভুলটিই না করেছি আমি! “না, না, এভাবে হবে না,” অনেকটা চিৎকার করে উঠলাম। “কারণ শুধু পরিসীমার মানের উপরই ক্ষেত্রফল নির্ভর করে না, পরিসীমাটির আকৃতি কীরূপ, আয়তকার, বৃত্তাকার, ডিম্বাকার, না অন্য কোনোরূপ, এটিও একটি বড় ব্যাপার। যেমন, নিচের চিত্রে, আয়তকার ক ও খ গুহার পরিসীমা প্রায় সমান, প্রত্যেকটি ৬ ইঞ্চির কাছাকাছি, কিন্তু ক-এর ক্ষেত্রফল, খ-এর ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণ।

“এছাড়া গুহার ভেতর কোনো জায়গায় যদি খুব সরু, লম্বা ফাটল থাকে, তাহলে পরিসীমা অনেক বেড়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সে অনুযায়ী ক্ষেত্রফল তেমন নাও বাড়তে পারে।”
“হ্যাঁ, বাবা, এভাবে হবে না।” ফারিনের গলার স্বরে খুশির পরিবর্তনটি সুস্পষ্ট।

এবার আমার মনে পড়ে গেল একাদশ শ্রেণীতে পড়া রসায়নের ক্লাসের কথা। স্পাইডারম্যান থেকে—না, রসায়নের ছাত্র নয়, বরং আবদ্ধ কোনো পাত্রে ছুটন্ত গ্যাসের অণু হয়ে গেলাম আমি, ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছি পাত্রের দেয়াল থেকে দেয়ালে। এক দেয়াল থেকে ধাক্কা খাবার পর গুণে যাচ্ছি কত কদম পর আবার আরেক দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছি। এভাবে অনেকক্ষণ ধরে একটি ধাক্কা ও তার পরবর্তী ধাক্কার মধ্যবর্তী দূরত্বের হিসেব রেখে একটি গড় দূরত্ব বের করা যায়, যার উপর ভিত্তি করে গড় মুক্ত-পথের সূত্র অনুযায়ী গুহার ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। গড় মুক্ত পথের দূরত্ব যত বেশি হবে, গুহার ক্ষেত্রফলও সে অনুযায়ী বেশি হতে থাকবে।

কাগজে বেলনাকৃতির জায়গায় একটি অণুর ছবি এঁকে সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম ফারিনকে। 

বেশ মনোযোগ দিয়ে ছবিটি দেখার পর ফারিন বলল, “তার মানে এ পদ্ধতি কাজ করবে যখন গুহার দেয়ালের অভ্যন্তরটি বাঁধাহীন, মুক্ত হয়, তাই না?”
“হ্যাঁ, তাই।” সায় দিলাম আমি।
“কিন্তু, বাবা, মনে করো, গুহার মাঝ বরাবর খুব পাতলা একটা পর্দার মতো ঝুলিয়ে দেয়া হলো। পর্দার দু’পাশে একদম অল্প করে মাত্র জায়গা রাখা হলো যাতে তা গলে গুহার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে গুহার ক্ষেত্রফল তেমন কমলো না বললেই চলে, কিন্তু প্রাণীটি এখন আগের চেয়ে আরো তাড়াতাড়ি গুহার দেয়ালে ধাক্কা খেতে থাকবে, তাই না? আর তখন হিসেবেও ভুল হয়ে যাবে।”

মমতামাখা বিস্ময়ে আপ্লুত হলো আমার হৃদয়, একটু গর্ববোধও। আলতো করে নেড়ে দেই ফারিনের চুলগুলো। পৃথিবীতে আশাবাদী, সুখী হবার কতই না অসংখ্য অপার বিষয় রয়েছে আমাদের, এবং চারপাশে।

About ম্যাভেরিক

4 comments

  1. ভালই লাগল। নেক্সত এ আরো চাই।

  2. ধন্যবাদ আপনাকে! অনেক ভাল লাগলো আপনার নতুন লিখা…..

  3. ভালো একটা আইডিয়া পেলাম, গড় মুক্ত পথের ব্যাপারটা তো নিয়ে আরেকটু ডিটেইলস গেলে আরো জ্ঞানগর্ভ হত। যাক গে, গনিত বিষয়ক পোস্টে যে সমীকরন, সংখ্যা থাকতেই হবে এমন কোন নিয়ম নেই। স্টিফেন হকিংও তো সমীকরন ছাড়াই সময়ের মত জিনিসেরও ইতিহাস লিখেছেন।

    “পৃথিবীতে আশাবাদী, সুখী হবার কতই না অসংখ্য অপার বিষয় রয়েছে আমাদের, এবং চারপাশে।”

    একদম ঠিক কথা, মন ভালো হয়ে যায় এমন কথা শুনলে।

Leave a Reply

Scroll To Top