Home / গণিতের ইতিহাস / গণিতের নোবেল, আবেল পুরস্কার ২০১১-এর উৎসবে

গণিতের নোবেল, আবেল পুরস্কার ২০১১-এর উৎসবে

গত ২৪শে মে নরওয়ের অসলোতে উদযাপিত হয় আবেল পুরস্কার ২০১১-এর উৎসব। গণিত ও সঙ্গীতে চমৎকার এক অপরাহ্ন কাটল সেদিন, এ লেখাটি তার উপর।

নোবেল ও আবেল পুরস্কার
ডাইনামাইট আবিষ্কার করার সুইডিশ রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেল (Alfred Nobel) আশাবাদী হয়ে উঠলেন, পৃথিবীতে যুদ্ধ-হানাহানির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিবদমান দুটি সৈন্যদল যখন উপলব্ধি করবে এক নিমেষে তারা পরস্পরকে ধ্বংস করতে সক্ষম, তখন পৃথিবীর সভ্য জাতিগণ নিশ্চয়ই তাদের সেনাবাহিনী রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না আর। কিন্তু পরিহাস, জীবনের শেষ দিনগুলোতে পৃথিবীতে শান্তি দেখে যাননি নোবেল; তার একটি বড় কারণ, ডাইনামাইট! মৃত্যুর পর তাঁর উইল শুনে বিস্মিত হয় পৃথিবীর মানুষ—সারা জীবনের অর্জিত বিশাল সম্পদের প্রায় পুরোটা তিনি দিয়ে গিয়েছেন সাহিত্য, পদার্থ, রসায়ন, শারীরবৃত্ত/চিকিৎসা এবং শান্তিতে মানবতার কল্যাণে বৃহত্তর অবদানের পুরস্কার হিসেবে।

নোবেলের তালিকায় গণিতের নাম নেই, এ আরেক বিস্ময়। মহান মানুষদের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ কিংবা সম্ভাবনা অনেককে আনন্দিত করে, কাজেই একটি গুজব চালু হয়ে যায় দ্রুত—কোনো এক গণিতবিদের কারণে ভেঙে গিয়েছিল নোবেলের সংসার, তাই প্রতিহিংসাপরায়ণ নোবেল বাদ দিয়েছেন গণিত। বাস্তবে নোবেল কখনো বিয়ে করেননি এবং প্রতিহিংসা তাঁর সঙ্গে যায় না, যদিও গুজবটি মরে না, কারণ দুঃখজনক হলেও আজকাল অধিকাংশ মানুষের মতামত ঠিক করে দেয় সংবাদপত্র, টিভি কিংবা ইন্টারনেট। নোবেলের জীবনের বিভিন্ন নথিপত্র পড়ে বোঝা যায়, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানের ফলিত শাখাগুলোকে পুরস্কৃত করা; গণিত কিংবা বিজ্ঞানের তত্ত্বীয় দিকে তিনি তেমন আগ্রহী ছিলেন না।

নোবেলের উইলে গণিতের উল্লেখ না থাকায় নরওয়ের বিখ্যাত গণিতবিদ সোফাস লাই (Sophus Lie) উদ্দ্যোগ নিলেন নরওয়ের ক্ষণজন্মা গণিতবিদ নীলস হেনরিক আবেলের (Niels Henrik Abel) নামে অনুরূপ একটি পুরস্কার চালু করার। ইউরোপ থেকে অনুদানের ব্যাপক সাড়াও পেলেন লাই, কিন্তু ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যাবার পর প্রচেষ্টাটি মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে আবেলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন কালে সুইডেন-নরওয়ের রাজা দ্বিতীয় অস্কার আবেলের সম্মানার্থে একটি পুরস্কারে আগ্রহী হন; ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে সুইডেন-নরওয়ের মধ্যকার রাষ্ট্রীয় সংঘের সমাপ্তি ঘটলে এ উদ্দ্যোগটিও বাতিল হয়ে যায়, কারণ ইউরোপীয় অনুদান সত্ত্বেও নরওয়ের সে সময়কার অর্থনৈতিক দরিদ্রাবস্থায় এত বড় পুরস্কার চালু করা অসম্ভব ছিল।

পরবর্তী বছরগুলোতে ডাকটিকেট ও ব্যাংকনোটে প্রতিকৃতি ছাপানোর মধ্য দিয়ে আবেলের প্রতি সম্মান জানিয়ে যেতে থাকে নরওয়েবাসীরা। ২০০০ সালে আবেলের জীবনীকার আরিল্ড স্টুবহাগ ও টেলিনরের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী টরমড হারম্যানসনের প্রচেষ্টায় ধূলোবালির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে পুরস্কারের প্রস্তাবটি এবং নরওয়ে সরকারের অনুদানে ২০০৩ সালে প্রথম আবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারটি, যার আর্থিক মূল্যমান ৬ মিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোনার (প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার) সাধারভাবে গণিতের নোবেল হিসেবেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

আবেল ও পঞ্চঘাতী সমীকরণ (Quintic Equation)
জন্ম ১৮০২, সচ্ছলতায়; মৃত্যু ১৮২৯, তীব্র দারিদ্রে, যক্ষ্মায়। আর চার মাস বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ঠিক ২৭, অবশ্য জন্মদিন পালন করার জন্য পাশে থাকত না কেউ। করূণ অপমানজনক অবস্থায় মারা গেছেন বাবা, বড় ভাই হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্য, মদ পানের মধ্য দিয়ে শোক ভোলার চেষ্টা করছেন মা। ইউরোপের গণিত সফরটিতে বড় ব্যর্থ হয়েছেন তিনি, শুধু সেই মেয়েটি, যাকে ভালবাসতেন, আয়ার কাজ করে যাচ্ছেন প্রাণপণে যাতে শীঘ্রই বিয়ে করতে পারেন তাঁরা। প্যারিস থেকে একসময় খবর আসে, পাওয়া গেছে তাঁর হারানো অভিসন্দর্ভটি আর পৃথিবীর মানুষ জানতে শুরু করে, নীলস হেনরিক আবেল করে ফেলেছেন গণিতের এমন কিছু কাজ, যা পার্থিব ক্ষুদ্র জীবনের বিনিময়ে তাঁর অমরত্বকে কেবল দীর্ঘায়িত করেই যাবে। অবশ্য মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ নেমে আসে তার পূর্বেই। জীবনের শেষ দিনগুলোতে কেবল মেয়েটির চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখত তাঁকে, প্রিয় বন্ধুকে অনুরোধ করে যান, মেয়েটির যেন দেখাশোনা করেন। আবেলের মৃত্যুর দেড় বছর পর বিয়ে করেন তাঁরা এবং শোনা যায়, বাকি জীবন সুখেই কাটে তাঁদের।

ব্যবহারিক জীবনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে গণিতের চমৎকার সৌন্দর্যময় শাখা বীজগণিত, যার একটি মূল উদ্দেশ্য সমস্যাকে সমীকরণে প্রকাশ করে তার সমাধান করা। 2x+7=0 একঘাতী এ সমীকরণটির সমাধান, আমরা সবাই জানি, x=\frac{-7}{2}। সাধারণভাবে, ax+b=0 সমীকরণের সমাধান হবে x=\frac{-b}{a}, যেখানে ab‘কে বলা হয় সমীকরণের সহগ (coeffcient)।

বীজগণিতের জনক আল-খোয়ারিজমি (Muḥammad ibn Musa Al-Khwarizmi) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ কিতাব আল যাবর ওয়াল মুকাবেলা-তে দ্বিঘাত সমীকরণ (Quadratic Equation) সমাধানের সাধারণ নিয়ম ব্যাখ্যা করে যান। আজকে যারা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে, তারা জানে x^2+7x+12=0 সমীকরণ কীভাবে সমাধান করতে হয়। তারা মধ্যপদ 7xকে বিস্তৃত করে উৎপাদকে বিশ্লেষণ করবে অথবা সরাসরি সহগসংক্রান্ত x = \dfrac{-b \pm \sqrt{b^2-4ac}}{2a} সূত্রটি ব্যবহার করবে।

কিন্তু ত্রিঘাত (Cubic) সমীকরণকেও কি এভাবে বীজগাণিতিকভাবে সূত্রের সাহায্যে, সহগের মাধ্যমে সমাধান করা যায়, যেখানে কেবল চারটি প্রাচীন গাণিতিক প্রক্রিয়া +, -, × ও ÷ এবং √ (করণী) ব্যবহার করা হবে? সমীকরণ সমাধানের এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় মূল-করণীর মাধ্যমে সমাধান (solution by radical), যার সন্ধানে গণিতে রচিত হয় হাজার বছরের অভিযান গাঁথা।

কবি ও গণিতবিদ ওমর খৈয়াম জ্যামিতিকভাবে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন বটে, কিন্তু বীজগাণিতিক সমাধান অধরাই থেকে যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী। ওদিকে আল-খোয়ারিজমির গণিত ইউরোপে বয়ে নিয়ে যান লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি, আদেলার্দ অব বাথ ও রজার বেকনের মত মনীষিগণ এবং খোয়ারিজমির পাঁচশ বছরেরও অধিক সময়কাল পরে প্রথমে ইটালির ডেল ফেরো, এবং পরে নিকোলো তার্তাগলিয়া ও জেরোলামো কার্দানো ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করতে সক্ষম হন। এর ঠিক পরপরই কার্দানোর ছাত্র লুদোভিকো ফেরারি চতুর্মাত্রিক (Quartic) সমীকরণ সমাধানের সূত্র আবিষ্কার করেন। গণিতের ইতিহাসে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান একদিকে বড় অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে এর সাথে জড়িত আছে অপমান ও প্রতিহিংসার করূণ এক ইতিহাস; সে কাহিনী বলব আরেক দিন।

পঞ্চঘাতী (Quintc) সমীকরণের সমাধানে এবার ঝাঁপিয়ে পড়ে গণিতবিদগণ। গণিত ততদিনে এগিয়ে গেছে বেশ, ডেকার্তে, ফার্মা, গাউস ও অয়লারের মতো গণিতবিদগণ চলে এসেছেন পৃথিবীতে, কিন্তু পঞ্চঘাতী সমীকরণ উন্মোচন করে না তার রহস্য। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইটালির পাওলো রুফিনি অসম্পূর্ণভাবে চেষ্টা করেন এবং ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে আবেল প্রমাণ করেন, সহগ-করণীর মাধ্যমে পঞ্চ কিংবা তার অধিক ঘাতের সমীকরণ সমাধানের সাধারণ কোনো সূত্র নেই! কিন্তু এ অসম্ভাব্যতাই সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গণিতের নবীন একটি শাখার, যার নাম গ্রুপ থিওরি। ফ্রান্সের আরেক অস্থির মেজাজী গণিতবিদ এভারিস্ত গ্যালওয়া মাত্র ২১ বছর বয়সে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে এর উপর আরো কিছু কাজ করে যান।

জন মিলনর–২০১১ সালের আবেল পুরস্কার বিজয়ী
অশীতিপর, সৌম্য চেহারার বৃদ্ধ, দেখলে বাচ্চাদের ভালোবাসে এমন দাদুর চেহারা ভেসে উঠে মনে। কথা বলেন ধীরে, লাজুক ভঙ্গিতে নরম স্বরে। পুরস্কার পান, বিজ্ঞান পরিষদের ভাষায়, ‘for pioneering discoveries in topology, geometry and algebra‘। অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ, গণিতের নানা শাখা সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন দশকের পর দশক। তার বিষয়সমূহ বেশ উচ্চতর লেভেলের, কাজেই টপোলজি নিয়েই দুয়েকটি প্রাথমিক কথা বলা যাক।

নরওয়ের রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ডের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করলেন জন মিলনর

টপোলজি (গ্রিক topos মানে জায়গা, logos মানে বিদ্যা) গণিতের প্রধান একটি শাখা যা বিভিন্ন জ্যামিতিক বস্তু, যেমন বক্ররেখা, তল, ত্রিমাত্রিক বস্তু প্রভৃতির আকৃতি নিয়ে আলোচনা করে থাকে। একটি বস্তুকে ক্রমাগত বাঁকিয়ে, টেনে বা দুমড়ে-হিঁচড়ে (ছেঁড়া বা জোড়া লাগানো ছাড়া) আকৃতি পরিবর্তন করলেও তার যেসব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকে, সেসব টপোলজির মূল বিষয়। টপোলজিতে বৃত্ত হয়ে যায় উপবৃত্তের সমতুল্য কারণ বৃত্তের ব্যাসের দু মাথায় ধরে চাপ দিলে বা টান দিলে বৃত্তের গোলাকার পেট চ্যাপ্টা হয়ে উপবৃত্তের আকার ধারণ করে। এটি মোটামুটি বোঝা যায়, কিন্তু আরো অবাক করা মজার বিষয় আছে, এখানে ঘনক ও গোলক সমতুল্য, ডোনাট ও এক হাতলওয়ালা চায়ের মগ সমতুল্য।

পুরস্কার বিতরণী শেষে হালকা কথা বলি মিলনরের সাথে। এক সময় শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব, উঠে আসে নানা কথা, হাসির ফোয়ারা ছুটে দর্শকদের মধ্যে। নিজেকে তিনি বিবেচনা করেন ধীর গতির গণিতবিদ হিসেবে, মাথায় বেশি হিসেব করতে পারেন না, দরকার হয় কাগজ কলম; তবে কোনো জিনিস, জ্যামিতিক কোনো চিত্র, ভালো দেখেন। ১৯৫৬ সালে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ‘সপ্তমাত্রিক Exotic Sphere’-এর দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করা হয়, মানুষ যেখানে মাত্র তিনটি মাত্রা দেখতে পায়, সেখানে তিনি কীভাবে সাতটি মাত্রা দেখেন? স্মিত লাজুক হেসে তিনি জবাব দেন, না না, সেটি চোখ দিয়ে দেখা নয়, নিজের ভেতর থেকে অনুভব করা, মনের চোখ দিয়ে দেখার মতো।

গণিত ও পদার্থবিদ্যার মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিজ্ঞান ধ্রুব নয়, পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে সুন্দর সূত্রটিও আগামীকাল ভুল প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু গণিত ধ্রুব, সবসময় ধরে রাখে তার সৌন্দর্য।

শিশু ও কিশোরদের প্রতি তার আহ্বান, তারা যেন ভালোবেসে গণিত শিখে, তাহলে গণিত সহজ হবে। তাঁর মতে, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য না বুঝেও গণিত মুখস্ত করতে বাধ্য হয়, আর এ শিক্ষাটা হয়ে উঠে ঘৃণার। ঘৃণার কোনো জিনিস ভালো ফলে বয়ে আনে না, তিনি বলেন, এবং শ্রেণীকক্ষকে আনন্দময় ও প্রাণবন্ত করার জন্য শিক্ষকদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেন।

অনুষ্ঠান শেষ হয় এক সময়, চলে যান সৌম্য চেহারার মানুষটি, কিন্তু রেখে যান স্নিগ্ধ অমলিন হাসি।

About ম্যাভেরিক

4 comments

  1. অনেক অপেক্ষার পরে একটি লেখা, :( আমি আরোও বেশি বেশি আশা করি আপনার কাছ থেকে,
    ভালো থাকবেন সবসময়

  2. “অনুষ্ঠান শেষ হয় এক সময়, চলে যান সৌম্য চেহারার মানুষটি, কিন্তু রেখে যান স্নিগ্ধ অমলিন হাসি।” 
    —-অনেক গুরত্তপূর্ণ তথ্য ……অনেক কিছু জানলাম…… ধন্যবাদ দিয়ে আর ছোট করব না ভালো থাকবেন সবসময়

  3. গণিত বিষয়ে নোবেল না থাকায় দুঃখ প্রকাশ করছি।

Leave a Reply

Scroll To Top